সাইফুর রহমান ওসমানী জিতু

 ২রা জুলাই, ২০২৫, লস এন্জেলেস ।  বাংলাদেশের ৭০’র দশকের সর্বকালের জনপ্রিয় গান ‘সাগরের তীর থেকে’ গানের প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পী জিনাত রেহানা আজ ২রা জূলাই, ২০২৫ সকাল ৮:৩০মিনিটে রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওইন্না ইলাইহে রাজেউন)। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় তিনি ভুগছিলেন। আজ আমার এমন একজন অত‍্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন বড়বোন সমতুল‍্য জীনাত রেহানার মৃত‍্যু সংবাদ নিয়ে লিখতে হবে, তা স্বপ্নেও ভাবিনি। গতকাল সকাল থেকেই নানাবিধ কারণে মনটা ভালো ছিলো না। এরই মধ‍্যে ঢাকা থেকে সংবাদ পেলাম জীনাত আপার মৃত্যু সংবাদ । আমি ডাকতাম ‘জীনাত আপা’ বলে।  ৭০’র দশকে বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান ঘোষক ছিলাম। সে সময়টি জীনাত রেহানার কন্ঠে ‘সাগরের তীর থেকে’, আমি কাঁকন দিয়ে ডেকেছিলেম’সহ বেশ কিছু গান প্রায়ই বেতারে বাজানো হতো। বিশেষ করে বেতারের দৈনিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগূলোর মধ্যে ছিলো আবু জাফর ও জায়েদ ইকবালের উপস্থাপনায় ‘বিজ্ঞাপন তরঙ্গ ‘ও হাবিবুর রহমান জালালের উপস্থাপনায় পরিবেশিত সৈনিক ভাইদের জন‍্য বিশেষ অনুষ্ঠান ‘দূর্বার’। আর সে অনুষ্ঠানে শ্রোতাদের বিশেষ অনুরোধে জীনাত রেহানার কন্ঠে জনপ্রিয় গানগুলো প্রায়ই পরিবেশন করা হতো।

জিনাত রেহানা ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হন এবং  ১৯৬৮ সালে জিনাত রেহানার কন্ঠে  ‘সাগরের তীর থেকে’ গানটি রেকর্ড করা হয়। এটি প্রচারের সাথে সাথে তিনি বিশেষ করে বেতার শ্রোতাদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি লাভ করেন। ব‍্যাক্তিগতভাবে আমি নিজেও লস এন্জেলেস শহরে বেশ কিছু অনুষ্ঠানে জীনাত আপাকে দিয়ে গান পরিবেশন করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। ভীষণ স্নেহ করতেন আমাকে। প্রবাসী শিল্পীদের তাঁদের সঙ্গীত চর্চায় অনেক উৎসাহ দিতেন। আমার মনে পড়ে, বেশ কয়েক বছর আগে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রবাসী বাংলাদেশী শহিদুল ইসলাম রনি’র লেখা ও অপর বাংলাদেশী কাজী নাজির হাসিবের সুরে বেশ কিছু বাংলা গানের একটি এ‍্যলবামে তিনি কন্ঠ দিয়েছিলেন ।  ১৯৬৫ সালে টেলিভিশনের শিল্পী হিসেবে তিনি গান শুরু করেন। জিনাত রেহানা ৬০’র দশকের তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশন, ঢাকা কেন্দ্র এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক মোস্তফা কামাল সৈয়দ এর সহধর্মিণী ছিলেন। মা ছিলেন প্রখ‍্যাত গীতিকার জেবুন্নেসা জামাল। ৭০’র দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘সুরবিতান’ নামে একটি অত‍্যন্ত জনপ্রিয় বাংলা আধুনিক গানের অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। বাংলাদেশের সে সময়কার সেরা কন্ঠশিল্পীরা এ অনুষ্ঠানে গান গাইবার সূযোগ পেতেন। অনুষ্ঠানের  প্রযোজক ছিলেন মোস্তফা কামাল সৈয়দ। আর সেখানেই জীনাত রেহানার সাথে পরিচয় এবং পরবর্তীতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কোভিডে মোস্তফা কামাল সৈয়দ মারা যাবার পরপরই জীনাত রেহানা একেবারে ভেঙে পড়েন এবং ঢাকায় অনেকটা নি:সঙ্গ ও একাকিত্ব জীবন-যাপন করেন । আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন। দুজনেই চিরবিদায় নিলেন মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে।

 জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত স্বামী মোস্তফা কামাল সৈয়দ স্ত্রী‘র পাশে থেকে সংগীত ও গবেষণার ক্ষেত্রে যুগিয়েছেন উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ও সাহস। দূ‘জনেই ছিলেন বিনয়ী, ধার্মিক, নিরহংকার প্রকৃতির একজন সাধারণ মানুষ ও একজন আজীবন সঙ্গী। উচ্চাভিলাস বা প্রচুর টাকা পয়শার মালিক হবার উচ্চাভিলাষ কখনোই দূ’জনকে আকৃস্ট করেনি। জীনাত রেহানার  পরিবারে রয়েছে  তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে রেহান কামাল সৈয়দ যুক্তরাষ্ট্রে একজন আইটি বিশেষজ্ঞ এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাঙ্গালী। মেয়ে রেহনুমা কামাল বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের  একজন প্রাক্তন বাংলা সংবাদ পাঠিকা। তাঁর স্বামী বাংলাদেশ বিমানের প্রাক্তন ক্যাপ্টেন ইশরাত আহমেদ। বর্তমানে তাঁরা সকলেই কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন ।

 জীনাত রেহানার গাওয়া জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে: সাগরের তীর থেকে, আমি কাকন দিয়ে ডেকেছিলেম, একটি ফুল আর একটি পাখি বলতো কি নামে তোমায় ডাকি,  আমি যার কথা ভাবছি মনে আনমনে, আমায় যদি ডাকো কাছে, কণ্ঠবীণা, মনে রেখো’সহ অসংখ্য গান। তিনি আধুনিক ও আধ্যাত্মিক গানের পাশাপাশি ছোটদের জন‍্যেও বিশেষ গানে কন্ঠ দিয়েছিলে । জীনাত রেহানা কন্ঠশিল্পীর পাশাপাশি তিনি বাংলা গান নিয়েও গবেষণায় কাজ করেন।  ঢাকার গুলশান আজাদ মসজিদে নামাজে জানাজার পর বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। দোয়া করি, আল্লাহ যেনো জীনাত আপাকে বেহেশ্তের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেন। আমিন।