ঘরে সন্তান আছে, কিন্তু পরিবারটি কোথায়- নন্দিনী লুইজা

শিল্প-সাহিত্য ৬ অক্টোবর ২০২৬ ৪৬২৬
ঘরে সন্তান আছে, কিন্তু পরিবারটি কোথায়- নন্দিনী লুইজা

রাত এগারোটা।

বাড়ির প্রতিটি ঘরে আলো জ্বলছে।

কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না।

বাবা ল্যাপটপে ব্যস্ত। মা মোবাইলের পর্দায়। বড় সন্তান নিজের ঘরে হেডফোন কানে দিয়ে বসে আছে। ছোটটি ট্যাব হাতে ভিডিও দেখছে।

এক ছাদের নিচে পাঁচজন মানুষ-কিন্তু প্রত্যেকের পৃথিবী আলাদা।

হঠাৎ ছোট সন্তানটি মায়ের কাছে এসে দাঁড়াল।

মা চোখ না তুলেই বললেন,

-“একটু পরে আসো।”

বাবা বললেন,

-“এখন না, খুব জরুরি কাজ করছি।”

শিশুটি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ঘরে ফিরে গেল।

সে কী বলতে চেয়েছিল, কেউ জানল না।

হয়তো স্কুলে কেউ তাকে অপমান করেছে।

হয়তো কোনো বন্ধুর সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছে।

হয়তো অনলাইনে কেউ তাকে অস্বস্তিকর কোনো কথা বলেছে।

হয়তো সে প্রথমবার নিজের শরীর, সম্পর্ক কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে।

অথবা হয়তো তার কোনো কারণই ছিল না।

সে শুধু চেয়েছিল-মা একটু তার দিকে তাকাক।

এই “একটু পরে” কথাটিই কখনো কখনো একটি শিশুর সঙ্গে পরিবারের দূরত্বের প্রথম ইট হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা সন্তানকে সবকিছু দিচ্ছি-শুধু নিজেদের সময়টুকু নয়,আমাদের সময় বদলেছে।সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অর্থের প্রয়োজন বেড়েছে। সামাজিক মর্যাদা, জীবনযাপন, শিক্ষা, পোশাক, বাসস্থান-সবকিছুতেই তুলনার প্রবণতা বেড়েছে।

কার সন্তান কোন স্কুলে পড়ে?

কার সন্তান বিদেশে গেল?

কার সন্তান কত ভালো ফল করল?

কার বাড়ি কত সুন্দর?

কার গাড়ি কত দামি?

কার সন্তান কী পরছে?

কার জীবন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কতটা ঝলমলে?

অন্যের জীবনের দৃশ্যমান সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে হওয়ার এই প্রতিযোগিতায় আমরা কখনো কখনো ভুলে যাই-সন্তানের শৈশব কোনো প্রতিযোগিতা নয়।

সন্তানকে ভালো ভবিষ্যৎ দেওয়ার জন্য অর্থ প্রয়োজন-এ সত্য অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। মা-বাবার পরিশ্রম, কর্মজীবন, ব্যবসা কিংবা পেশাগত সাফল্যও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো-সন্তানের ভবিষ্যৎ কিনতে গিয়ে আমরা কি তার বর্তমানটুকু হারিয়ে ফেলছি?

একটি শিশুর ঘরে দামি বিছানা থাকতে পারে, সর্বাধুনিক মোবাইল থাকতে পারে, আলাদা পড়ার টেবিল থাকতে পারে, ভালো স্কুল থাকতে পারে।

কিন্তু তার কি এমন একজন মানুষ আছে, যার কাছে সে নির্ভয়ে বলতে পারে-“আজ আমার মনটা ভালো নেই”?মোবাইলকে দোষ দিয়ে কি আমরা দায়মুক্ত হতে পারি?প্রযুক্তি আমাদের শত্রু নয়।প্রযুক্তি শিক্ষা দিয়েছে, যোগাযোগ সহজ করেছে, পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে ডিজিটাল দক্ষতা শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয়।বাংলাদেশেও শিশুদের ডিজিটাল সাক্ষরতা ও নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে UNICEF দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। UNICEF-এর পরামর্শে শিশুর অনলাইন যোগাযোগ নিয়ে খোলামেলা কথা বলা, ডিভাইস ব্যবহারের পারিবারিক নিয়ম তৈরিতে শিশুকে যুক্ত করা এবং সমস্যায় পড়লে বিশ্বস্ত বড় মানুষের কাছে বলতে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ সমাধান শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া নয়।

আবার মোবাইলের হাতে সন্তানকে ছেড়ে দেওয়াও নয়।

সমাধান হলো-সন্তানের ডিজিটাল জীবনের ভেতরেও বাবা-মায়ের উপস্থিতি তৈরি করা।

সে কী দেখে, কার সঙ্গে কথা বলে, কী ধরনের কনটেন্ট তাকে প্রভাবিত করছে-এসব সম্পর্কে জানতে হবে।কিন্তু জানতে হবে সম্পর্কের মাধ্যমে, সন্দেহের মাধ্যমে নয়।কারণ সন্তানকে প্রতিটি মুহূর্তে জেরা করলে সে তথ্য লুকাতে শিখবে।

আর বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করলে সে নিজেই অনেক কথা বলতে শুরু করবে।

UNICEF বাংলাদেশও সতর্ক করেছে যে অনলাইনে শিশুরা ক্ষতিকর কনটেন্ট, সাইবারবুলিং, শোষণসহ নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে। তাই প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানো জরুরি।

সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গাটি হলো-সন্তান যখন নিজের কথা বলা বন্ধ করে দেয়,একটি শিশু যখন ভুল করে, তখন পরিবার তার জন্য নিরাপদ জায়গা কি না-সেখানেই আসল পরীক্ষা।

সে কি এসে বলবে-“আমি ভুল করেছি।”

নাকি ভাববে-“এ কথা জানলে বাবা-মা আমাকে অপমান করবে, বকবে, ফোন কেড়ে নেবে, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে দেবে না।”

যে সন্তান ভুলের কথা বাবা-মাকে বলতে পারে না, সে ভুল করা বন্ধ করেছে-এমন নয়।

সে শুধু ভুলের কথা বলা বন্ধ করেছে।

এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ শিশুর জীবনে কৈশোর আসে, বন্ধুত্ব আসে, প্রেম আসে, আকর্ষণ আসে, পরিচয়ের প্রশ্ন আসে, ব্যর্থতা আসে, হতাশা আসে।

সবকিছু সে বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে অনুভব করবে না।তাই তাকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়।তাকে এমন সম্পর্ক দিতে হবে, যেখানে বিপদে পড়লে সে প্রথমে পরিবারের কথাই মনে করে।অতিরিক্ত আদরও কখনো কখনো সন্তানের ক্ষতি করতে পারে,আমরা সন্তানকে এত ভালোবাসি যে তার কোনো চাহিদা অপূর্ণ রাখতে চাই না।

সে যা চায়-দিই।

যে ফোন চায়-দিই।

যে পোশাক চায়-দিই।

যেখানে যেতে চায়-নিয়ে যাই।

ভুল করলে বলি, “ও তো ছোট।”

অন্যায় করলে বলি, “বাচ্চারা এমন করেই।”

তার হয়ে আমরা ক্ষমা চাই।তার হয়ে আমরা সমস্যা সমাধান করি।

তার হয়ে আমরা জীবনটাও অনেক সময় বেছে দিতে চাই।কিন্তু সন্তান কি তখন জীবনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে?নাকি শুধু সুবিধার জন্য অভ্যস্ত হচ্ছে?ভালোবাসা মানে সন্তানের প্রতিটি চাহিদা পূরণ করা নয়।কখনো ভালোবাসা মানে ‘না’ বলা।

কখনো অপেক্ষা করতে শেখানো।কখনো নিজের কাজ নিজেকে করতে দেওয়া।কখনো নিজের ভুলের ফল নিজেকেই বুঝতে দেওয়া।কারণ পৃথিবী সন্তানের প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ করবে না।

আবার নিয়ন্ত্রণও ভালোবাসার বিকল্প নয়

অন্যদিকে কিছু পরিবারে সন্তানকে ভালো রাখার নামে তার চারপাশে এমন এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করা হয়, যেখানে তার নিজের কোনো জায়গা থাকে না।

কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে-বাবা-মা ঠিক করবেন।

কী পড়বে-বাবা-মা ঠিক করবেন।

কোথায় যাবে-বাবা-মা ঠিক করবেন।

কী পরবে-বাবা-মা ঠিক করবেন।

মোবাইলে কার সঙ্গে কথা বলবে-সেটিও বাবা-মা ঠিক করবেন।

সন্তানের জীবন যেন তার নিজের নয়-পরিবারের একটি প্রকল্প।

এমন নিয়ন্ত্রণে সন্তান হয়তো কিছুদিন চুপ থাকবে।

কিন্তু চুপ থাকা মানেই সম্মতি নয়।

অনেক সময় চুপ থাকা মানে-সে আর কথা বলে লাভ আছে বলে মনে করছে না।

WHO-এর parenting guidelines-ও মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক উন্নত করা এবং কঠোর/ক্ষতিকর parenting কমানোর গুরুত্ব তুলে ধরে।

অর্থাৎ শিশুকে শুধু পরিচালনা করার বিষয় নয়; তার সঙ্গে সম্পর্কটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাবা-মায়েরও একটু আয়নায় তাকানো দরকার

আমরা সন্তানকে বলি-“মোবাইল কম ব্যবহার করো।”কিন্তু আমরা নিজেরা কি ফোন নামাই?

আমরা বলি-“অন্যের সঙ্গে তুলনা করবে না।”

কিন্তু নিজেরাই কি অন্যের বাড়ি, গাড়ি, পোশাক, সন্তান, জীবন দেখে নিজেদের মাপি না?

আমরা বলি-“আমার সঙ্গে সব কথা বলবে।”

কিন্তু সন্তান কথা শুরু করলেই কি আমরা বলি না-“এখন সময় নেই।”

আমরা বলি-“তোমার ভালো চাই।”

কিন্তু কখনো কি জানতে চাই-“তোমার কাছে ভালো থাকা বলতে কী বোঝায়?”

শিশুরা আমাদের কথার চেয়ে আমাদের আচরণ থেকে বেশি শেখে।

তাই সন্তানকে বদলানোর আগে পরিবারকে নিজেদের জীবনযাপনটাও একটু দেখতে হবে।

পরিবার মানে একই ছাদের নিচে থাকা নয়

একটি বাড়িতে পাঁচজন মানুষ থাকতে পারে।

তবু সেখানে পরিবার নাও থাকতে পারে।

পরিবার তৈরি হয় যখন-একজনের কান্নায় অন্যজন থামে।একজনের ভয়কে অন্যজন উপহাস করে না।একজনের ভুলকে অন্যজন সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে না।একজন কথা বললে অন্যজন ফোন নামিয়ে রাখে।

একজন “আমি পারছি না” বললে অন্যজন বলে-

“চলো, একসঙ্গে চেষ্টা করি।”

সন্তানকে নিরাপদ রাখতে দরজা-জানালায় তালা লাগানো যথেষ্ট নয়।তার জন্য একটি নিরাপদ সম্পর্কের দরজাও খোলা রাখতে হয়।

আজকের পরিবারে সবচেয়ে জরুরি প্রযুক্তি-কথোপকথনআমরা parental control-এর কথা বলি।Screen time-এর কথা বলি।Privacy setting-এর কথা বলি।

কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা হয়তো এখনও একটি পুরোনো জিনিস-বিশ্বাস।যে সন্তান জানে-“আমি বিপদে পড়লে মা-বাবাকে বললে তারা প্রথমে আমার কথা শুনবে”-সে অনেক বিপদে সাহায্য চাইতে পারবে।আর যে সন্তান জানে-“সত্য বললে আগে বকুনি খাব”-সে হয়তো সত্যটাই লুকাবে। তাই ঘরে কিছু নিয়ম করা দরকার।খাবার সময় ফোন নয়। ঘুমের সময় ফোন নয়।পরিবারের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময় কথা বলা।

বয়স অনুযায়ী প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানো।

সন্তানের সঙ্গে অনলাইন জগতের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলা।কিন্তু এসব নিয়ম শুধু সন্তানের জন্য নয়।বাবা-মায়ের জন্যও।কারণ যে মা-বাবা নিজেরাই সারাক্ষণ স্ক্রিনে ডুবে থাকেন, তাঁদের মুখে “মোবাইল কম ব্যবহার করো” কথাটি সন্তানের কাছে খুব শক্তিশালী বার্তা হয়ে পৌঁছায় না।

পরিবার ভেঙে গেলে শুধু একটি ঘর ভাঙে না

সমাজের প্রথম বিদ্যালয় পরিবার।সেখানেই শিশু প্রথম ভাষা শেখে, সম্মান শেখে, দায়িত্ব শেখে, মতভেদ শেখে, ক্ষমা শেখে, ভালোবাসা শেখে।

পরিবারে যদি সে কেবল ভয় দেখে, সে ভয়কে সম্পর্কের ভাষা ভাবতে পারে।পরিবারে যদি সে কেবল প্রতিযোগিতা দেখে, সে মানুষকেও প্রতিযোগী ভাবতে পারে।পরিবারে যদি সে সংলাপ দেখে, সে কথা বলতে শেখে।পরিবারে যদি সে সম্মান দেখে, সে অন্যকে সম্মান করতে শেখে।

এই কারণেই পরিবারকে শুধু ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না।

একটি শিশুর সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্ক ভবিষ্যতের সমাজের ওপরও প্রভাব ফেলে।

শেষ প্রশ্নটি আমাদের সবার জন্য,আজ রাতে যখন সন্তানটি ঘুমিয়ে পড়বে, আমরা কি একবার তার মুখের দিকে তাকাব?তার ঘরে দামি জিনিস আছে কি না-সেটি নয়।তার মনটায় কী জমে আছে-সেটি ভাবব?

সে কত নম্বর পেয়েছে-সেটি নয়।

সে কতটা নিরাপদ বোধ করছে-সেটি ভাবব।

সে আমাদের কথা শোনে কি না-সেটি নয়।

সে আমাদের কাছে নিজের কথা বলতে পারে কি না-সেটি ভাবব?

কারণ সন্তানকে বড় করা মানে শুধু তাকে পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করা নয়।কখনো কখনো এর অর্থ হলো-পৃথিবীর ভিড়ে তার যেন একটি নিরাপদ ঘর থাকে, সেটি নিশ্চিত করা।অর্থ দরকার।শিক্ষা দরকার।প্রযুক্তি দরকার।

স্বাধীনতা দরকার।শাসনও দরকার।

কিন্তু সবকিছুর আগে দরকার একটি সম্পর্ক-

যেখানে সন্তান ভুল করেও ফিরে আসতে পারে।

যেখানে প্রশ্ন করলেও অপমানিত হয় না।

যেখানে সত্য বললেও ভালোবাসা হারায় না।

যেখানে বাবা-মা শুধু তার ভবিষ্যৎ বানানোর কারিগর নন-তার বর্তমান জীবনের সঙ্গী।

হয়তো আমাদের সন্তানদের আরেকটি দামি মোবাইলের প্রয়োজন নেই।

হয়তো তাদের প্রয়োজন-একটি ফোন নামানো হাত,দুটি মনোযোগী চোখ,কিছু না-বলা কথা শোনার সময়,আর একটি নিশ্চয়তা-“যা-ই হোক, আগে বাড়ি ফিরে এসো।তোমার কথা আমরা শুনব।”কারণ একটি সন্তানকে হারানো সবসময় তাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে হয় না।

কখনো সে একই ঘরে বসে থাকে-শুধু তার মনটি আর সেখানে থাকে না।আর সেই দিনটি আসার আগেই আমাদের নিজেদের ঘরের দরজায় কড়া নাড়তে হবে। সন্তানটি ঘরে আছে।

লেখক কলামিস্ট প্রকাশক ও সমাজকর্মী

আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন