প্রেমিক যখন স্বামী হয়, প্রেমিকা যখন স্ত্রী-তখন প্রেম কোথায় হারিয়ে যায়!!!

শিল্প-সাহিত্য ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪৫৮৯
প্রেমিক যখন স্বামী হয়, প্রেমিকা যখন স্ত্রী-তখন প্রেম কোথায় হারিয়ে যায়!!!

নন্দিনী লুইজা

একজন মানুষকে প্রেমের সময় পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য এবং নিরাপদ মানুষ মনে হয়। মনে হয়-জীবনের যত ঝড় আসুক, দুজন পাশাপাশি দাঁড়াবে; সিদ্ধান্ত হবে আলোচনায়, ভুল হলে হবে সংশোধন, কষ্ট হলে থাকবে সান্ত্বনা, আর মতের অমিল হলেও থাকবে পরস্পরের প্রতি সম্মান।

তাহলে বিয়ের পর সেই সমীকরণ বদলে যায় কেন???

যে মানুষটি প্রেমের সময় সমান সঙ্গী ছিল, সে কেন কখনো স্বামী হওয়ার পর কর্তা হয়ে ওঠে?

যে নারী প্রেমের সময় ছিল সহযাত্রী, সে কেন স্ত্রী হওয়ার পর অধীনস্থ হয়ে পড়ে?

উপার্জন শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে কেন কোনো কোনো পুরুষের মনে জন্ম নেয়-“আমি টাকা উপার্জন করি, তাই সিদ্ধান্তও আমিই নেব”এ প্রশ্ন কোনো একটি দাম্পত্যের নয়। শিক্ষিত সমাজের অসংখ্য সংসারের ভেতরে নীরবে ঘুরে বেড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিশেষ করে যখন প্রেমিক-প্রেমিকা একই শ্রেণিকক্ষের সহপাঠী হয়, তখন বৈপরীত্যটি আরও স্পষ্ট।একই বেঞ্চে বসে দুজন মানুষ একে অপরকে চিনেছে। একই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। একজন অন্যজনের মেধাকে সম্মান করেছে। স্বপ্নের কথা বলেছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছে।সেখানে কেউ কারও কর্তা ছিল না।কিন্তু বিয়ের পরে হঠাৎ সম্পর্কের অভিধানে ঢুকে পড়ে-স্বামী, স্ত্রী, সংসার, কর্তৃত্ব, দায়িত্ব, উপার্জন, সামাজিক প্রত্যাশা।আর কখনো কখনো “স্বামী” শব্দটি ভুলভাবে “কর্তা” হয়ে যায়। সমস্যার শুরু সেখানেই।

উপার্জন কি কর্তৃত্বের লাইসেন্স-

একজন পুরুষ উপার্জন করেন-এটি তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কিন্তু উপার্জন তাকে স্ত্রীর ওপর মালিকানা দেয় না।অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন আর পারিবারিক কর্তৃত্ব এক বিষয় নয়।“আমি সংসারের খরচ চালাই”-এটি দায়িত্বের কথা।“তাই সংসারে আমার কথাই শেষ কথা”-এটি ক্ষমতার কথা।এই দুই বাক্যের মাঝখানে রয়েছে একটি বিশাল নৈতিক পার্থক্য।সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্ত্রী কখন কোথায় যাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কী পরবে, কীভাবে নিজের অর্থ ব্যয় করবে, কোন সিদ্ধান্ত নেবে-এসব ক্ষেত্রেও যদি উপার্জনকারী স্বামী নিজেকে চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ মনে করতে শুরু করে, তাহলে সম্পর্কটি আর অংশীদারিত্বের থাকে না।এমনকি স্ত্রী নিজেও যদি উপার্জন করে, তখনও একই প্রশ্ন থাকে-কে বেশি উপার্জন করে, তা নয়; কে কতটা সম্মান পায়। কারণ দাম্পত্যের মর্যাদা বেতনের অঙ্ক দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়।

শিক্ষিত হলেই কি মানসিকতা শিক্ষিত হয়-এখানে একটি কঠিন সত্য সামনে আসে।একজন মানুষ উচ্চশিক্ষিত হতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকতে পারে, বড় চাকরি করতে পারে, সমাজে সম্মানিত হতে পারে-কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রে সে যদি মনে করে, “আমি পুরুষ, তাই আমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত,” তাহলে শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনও তার জীবনে পৌঁছায়নি।শিক্ষা শুধু তথ্য জানার ক্ষমতা নয়।

শিক্ষা মানে নিজের ক্ষমতার সীমা বোঝা।

শিক্ষা মানে অন্য মানুষের স্বাধীনতাকে সম্মান করা।শিক্ষা মানে ভুল হলে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারা।তাই দাম্পত্যের শিক্ষাও আলাদা করে শেখা দরকার।

একই ক্লাসের প্রেমিক-প্রেমিকা কেন দূরে সরে যায়-ক্লাসমেটকে বিয়ে করা সম্পর্কের একটি বিশেষ সৌন্দর্য আছে-দুজনের একটি যৌথ ইতিহাস থাকে।কিন্তু সেই ইতিহাসই কখনো কখনো কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ যে নারী জানে তাঁর স্বামী একদিন কীভাবে তার সঙ্গে বন্ধুর মতো কথা বলতো, সে পরে যখন আদেশের ভাষা শুনতে পান, তখন পরিবর্তনটি আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়।যে পুরুষ একদিন প্রেমিকার স্বপ্ন শুনে উৎসাহ দিতো, সে যদি পরে সেই স্বপ্নকে “সংসারের জন্য অপ্রয়োজনীয়” বলতে শুরু করে, তখন শুধু একটি স্বপ্নই ছোট হয় না-ছোট হয়ে যায় সেই মানুষটির ব্যক্তিসত্তা।তখন প্রশ্ন ওঠে-বিয়ে কি একজন মানুষকে অন্যজনের অধীন করে দেওয়ার প্রতিষ্ঠান, নাকি দুইজন স্বাধীন মানুষের দীর্ঘ সহযাত্রার নাম। উত্তরটি স্পষ্ট হওয়া দরকার।বিয়ে কোনো মালিকানা দলিল নয়।তাহলে সমাধান কোথায়? সমাধান প্রেমের প্রথম দিনের আচরণ হুবহু ফিরিয়ে আনা নয়।সমাধান হলো প্রেমের সময়কার সমতা ও সম্মানকে সংসারের পরিণত সম্পর্কের ভিত বানানো।স্বামীকে মনে রাখতে হবে-স্ত্রী তার কর্মচারী নয়।সে তার অধীনস্থ নয়।সে তার সম্পত্তিও নয়।সে জীবনসঙ্গী।আর স্ত্রীকেও মনে রাখতে হবে-সংসার মানে নিজের কণ্ঠস্বর বন্ধ করে দেওয়া নয়। ভালোবাসা মানে অন্যায় মেনে নেওয়া নয়। মানিয়ে চলা মানে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দেওয়া নয়।দুজনেরই কিছু অভ্যাস বদলানো দরকার।আদেশের বদলে আলোচনা। নিয়ন্ত্রণের বদলে বিশ্বাস।অভিযোগের বদলে সংলাপ।অহংকারের বদল স্বীকারোক্তি।

ক্ষমতার বদলে অংশীদারিত্ব।একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রশ্ন হতে পারে-“তোমার কী মত?”এই ছোট প্রশ্নটি অনেক বড় সম্পর্ক রক্ষা করতে পারে। অর্থের ক্ষেত্রে দুজনের স্বচ্ছতা থাকতে পারে। বড় ব্যয়ের সিদ্ধান্ত যৌথভাবে নেওয়া যেতে পারে। ব্যক্তিগত সময়, পেশা, বন্ধুত্ব ও স্বপ্নের জন্য দুজনেরই স্বাধীন পরিসর থাকা দরকার।আর সপ্তাহে অন্তত কিছু সময় এমন হওয়া দরকার, যখন তারা শুধু স্বামী-স্ত্রী নয়-আবার সেই পুরোনো দুই বন্ধু হয়ে কথা বলবে। সন্তানের পড়াশোনা নয়।বাজারের হিসাব নয়। শ্বশুরবাড়ি বা বাপেরবাড়ির আলোচনা নয়।শুধু-“কেমন আছ?”এই প্রশ্নের উত্তর শোনার সময়টুকু।সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজের আচরণকে বাইরে থেকে দেখা।একজন স্বামী নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে-“আমি কি স্ত্রীকে ভালোবাসি, নাকি তাকে নিয়ন্ত্রণ করি?”“আমার উপার্জন কি তাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, নাকি ভয়?”“আমি কি তার মতামত শুনি, নাকি শুধু আমার সিদ্ধান্ত জানাই?” “প্রেমের সময় যে স্বাধীন মানুষটিকে ভালোবেসেছিলাম, বিয়ের পরে কি সেই স্বাধীনতাকেই আমি সীমাবদ্ধ করছি?”

একজন স্ত্রীও নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে-“সংসার রক্ষার নামে কি নিজের কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলছি?”“অভিমান জমিয়ে রাখছি, নাকি কথা বলছি?”“স্বামীকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলছি, নাকি সমস্যাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছি?”এই আত্মজিজ্ঞাসাই সংশোধনের শুরু।কারণ সম্পর্কের পরিবর্তন সবসময় অন্যজনকে বদলানোর মাধ্যমে আসে না।কখনো নিজের ভাষা বদলাতে হয়। কখনো নিজের অহংকার কমাতে হয়।কখনো নিজের ভুল স্বীকার করতে হয়। আবার কখনো নিজের সীমারেখা স্পষ্ট করতে হয়।

প্রেমিক যখন স্বামী হয়, তার প্রেমিক সত্তাটি যেন মারা না যায়।প্রেমিকা যখন স্ত্রী হয়, তার স্বতন্ত্র সত্তাটিও যেন হারিয়ে না যায়।সংসারের চাপে প্রেমের ভাষা বদলাতে পারে, কিন্তু সম্মানের ভাষা বদলানো উচিত নয়। একজন বেশি উপার্জন করতে পারে, অন্যজন কম।একজন সংসারের বাইরে বেশি কাজ করতে পারে, অন্যজন ঘরের ভেতরে বেশি শ্রম দিতে পারে। কিন্তু কোনো অবদানই অন্য মানুষের মর্যাদার ওপর মালিকানা তৈরি করে না।কারণ সংসারে প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়-“কার কথা শেষ কথা?”

প্রশ্ন হওয়া উচিত“কীভাবে দুজনের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়?”স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি তাই শুধু একসঙ্গে বুড়ো হয়ে যাওয়া নয়।বরং বহু বছর পরেও পাশাপাশি বসে মনে হওয়া-এই মানুষটি এখনও সেই মানুষ, যার কাছে নিজের মন খুলে বলা যায়।

যার কাছে দুর্বল হওয়া যায়।যার সঙ্গে মতের অমিল হতে পারে, কিন্তু অসম্মান নয়। যার হাতে হাত রাখা যায়, কিন্তু নিজের স্বাধীনতা হারাতে হয় না।

প্রেমের সত্যিকারের পরীক্ষা বিয়ের আগে নয়।পরীক্ষা শুরু হয় তখন, যখন ভালোবাসার মানুষটির ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ তৈরি হয়।সেই সুযোগে যে মানুষ কর্তৃত্ব নয়, সম্মান বেছে নেয়- সেখানেই প্রেম পরিণত হয়।সেখানেই প্রেমিক সত্যিকারের স্বামী হয়।সেখানেই প্রেমিকা সত্যিকারের স্ত্রী হয়।আর সেখানেই একটি সংসার শুধু টিকে থাকে না-

মানুষ হয়ে থাকার একটি সুন্দর বিদ্যালয় হয়ে ওঠে।

ভালোবাসা ফিরবে কীভাবে, সম্পর্ক বদলাবে কীভাবে-

শুধু “একে অপরকে ভালোবাসি”এই উপদেশে দাম্পত্যের জটিল সমস্যা মেটে না। অনেক দম্পতি ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসা সুস্থ আচরণে প্রকাশ করতে জানে না। তাই আবেগের পাশাপাশি দরকার কিছু বাস্তব নিয়ম। নিয়মটি কঠিন, কিন্তু জরুরি-উপার্জনকারী ব্যক্তি সংসারের কর্তা নন; তিনি একজন অংশীদার।স্বামী বেশি উপার্জন করলে সেটি পরিবারের শক্তি, স্ত্রীর ওপর ক্ষমতা নয়। বড় খরচ, সঞ্চয়, ঋণ বা আর্থিক সিদ্ধান্তে দুজনেরই জানা ও মতামত থাকা উচিত। তবে এর অর্থ প্রতিটি টাকা নিয়ে জেরা নয়; প্রত্যেকের কিছু ব্যক্তিগত আর্থিক স্বাধীনতা থাকতে পারে। লক্ষ্য নিয়ন্ত্রণ নয়, স্বচ্ছতা।

জীবনসঙ্গী কোথায় যাবে, কার সঙ্গে দেখা করবে বা কখন নিজের পরিবারে যাবে-এসব নিয়ে পারস্পরিক যোগাযোগ স্বাভাবিক। কিন্তু সবকিছুকে “অনুমতি”র বিষয় বানালে অংশীদারিত্ব কর্তৃত্বে পরিণত হয়।তাই“তুমি সেখানে যেতে পারবে না”-এর বদলে,“তুমি গেলে আমার এই চিন্তাটা হয়, আমরা কি বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে পারি?”“আমি বলেছি, তাই হবে”-এর বদলে,“দুজনের জন্য কোন সিদ্ধান্তটা ভালো হবে?”ভাষা বদলালেই সম্পর্কের অর্থ বদলাতে শুরু করে।

ঝগড়ার সময় সিদ্ধান্ত নয়-রাগের কয়েক মিনিটে বলা কথা দাম্পত্যের বড় ক্ষতি করতে পারে। তাই নিয়ম হওয়া উচিত-রাগের সময় সম্পর্ক ভাঙার সিদ্ধান্ত নয়।“তোমাকে আর দরকার নেই”, “বাপের বাড়ি চলে যাও”, “ডিভোর্স দিয়ে দেব”-এ ধরনের কথা ঝগড়ার অস্ত্র করা যাবে না।

রাগ বেশি হলে বলা যায়-“এখন দুজনেরই রাগ বেশি। আমরা এক ঘণ্টা পরে/আজ রাতে/আগামীকাল শান্তভাবে কথা বলব।”তবে বিরতি মানে দিনের পর দিন নীরব থেকে শাস্তি দেওয়া নয়; নির্দিষ্ট সময়ে আলোচনায় ফিরতে হবে।

অভিযোগ নয়, নির্দিষ্ট আচরণ নিয়ে কথা“তুমি কোনোদিন আমাকে বোঝো না”, “তুমি সবসময় এমন করো”- এ ধরনের কথা মানুষকে আত্মরক্ষামূলক করে।তার বদলে বলা যায়-“গতকাল সবার সামনে তুমি যেভাবে কথাটা বলেছ, তাতে আমি অপমানিত বোধ করেছি।”অথবা“আমার সঙ্গে সিদ্ধান্তটা আলোচনা না করায় মনে হয়েছে, আমার মতামতের মূল্য দেওয়া হয়নি।”এতে সমস্যাটা স্পষ্ট হয়।

সপ্তাহে একদিন “সংসার সভা”সপ্তাহে ৩০–৪৫ মিনিট শুধু দুজন বসে চারটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারেন-১. টাকা-পয়সা: কী খরচ হয়েছে, সামনে কী খরচ আছে।২. সংসার: কোন কাজে চাপ হচ্ছে, কে কীভাবে সাহায্য করবে।৩. সন্তান ও পরিবার: কোনো সমস্যা বা সিদ্ধান্ত আছে কি না।৪. সম্পর্ক: কোনো অভিমান বা কষ্ট জমেছে কি না।তবে এক সপ্তাহের আলোচনায় দশ বছরের পুরোনো হিসাব টেনে আনা যাবে না। যতটা সম্ভব, সমস্যাগুলো সময়মতো সমাধান করতে হবে।

ঘরের কাজকে “সাহায্য” বলা বন্ধ করতে হবে-স্বামী রান্না করলে, সন্তানকে পড়ালে, বাজার করলে বা ঘর পরিষ্কার করলে তিনি স্ত্রীকে “সাহায্য” করছে না; নিজের সংসারের কাজ করছে।একইভাবে স্ত্রী স্বামীর যত্ন নিলে সেটি ভালোবাসার অংশ হতে পারে, কিন্তু বাধ্যতামূলক সেবা নয়।“এটা স্ত্রীর কাজ” বা “এটা স্বামীর কাজ”-এই পুরোনো ছক ক্ষোভ বাড়ায়।

প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য আলাদা সময়-সন্তান, কাজ, বিল ও আত্মীয়তার ভিড়েও সপ্তাহে অন্তত একবার এমন সময় দরকার, যখন দুজন শুধু দুজন থাকবে।বাইরে খেতে যাওয়া জরুরি নয়। ছাদে বসে চা খাওয়া, রাতে দশ মিনিট হাঁটা, পুরোনো ছবি দেখা বা বিয়ের আগের স্মৃতি নিয়ে কথা বলাও যথেষ্ট।শুধু একটি শর্ত-সেই সময় সংসারের সমস্যা নিয়ে মিটিং নয়।দুজনকে মনে রাখতে হবে, তারা শুধু বাবা-মা বা সংসারের কর্মী নয়; তারা একে অপরের ভালোবাসার মানুষ।

সপ্তাহে অন্তত একবার একটি ভালো কথা-সময়ের সঙ্গে আমরা অপরজনের ভুল দেখতে দেখতে তার ভালো দিকগুলোকে স্বাভাবিক ধরে নিই। তাই সচেতনভাবে বলতে হবে-“তুমি আজ যে কাজটা করেছ, সেটা ভালো লেগেছে।”“তুমি সংসারের জন্য যে পরিশ্রম করো, সেটা আমি দেখি।”“তুমি আমার কথা মন দিয়ে শুনেছ-ধন্যবাদ।”“তোমাকে পাশে পেয়ে আমি নিরাপদ বোধ করি।” মানুষ শুধু ভুলের সংশোধনে বদলায় না; নিজের ভালো দিকের স্বীকৃতি পেয়েও বদলায়।

ক্ষমা চাওয়ার পদ্ধতি বদলাতে হবে-“আচ্ছা, সরি”-বলে বিষয় শেষ করা যথেষ্ট নয়। সত্যিকারের ক্ষমা হতে পারে-“আমি যেভাবে তোমার সঙ্গে কথা বলেছি, সেটা ভুল হয়েছে। তুমি কষ্ট পেয়েছ, সেটা বুঝতে পারছি। পরের বার রাগ হলে আমি এভাবে কথা বলব না।”তারপর আচরণেও তা প্রমাণ করতে হবে।কারণ ক্ষমা চাওয়া শুধু শব্দ নয়; একই ভুল পুনরাবৃত্তি না করার চেষ্টা।

নিজের জন্যও একজন মানুষ হয়ে থাকা-বিয়ের পর কেউ যেন শুধু “সংসারের কর্মী” হয়ে না যায়।স্ত্রীর নিজের বন্ধু, পড়াশোনা, পেশা ও আগ্রহ থাকতে পারে। স্বামীরও নিজের বন্ধু, ব্যক্তিগত সময়, আগ্রহ ও মানসিক পরিসর দরকার।দুজনের স্বাধীনতা থাকবে, তবে তা গোপনীয়তা বা বিশ্বাসভঙ্গের আড়াল নয়।স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব-দুটো পাশাপাশি চলবে।আর যদি সমস্যা ইতিমধ্যে গভীর হয়ে যায়?দীর্ঘদিনের অপমান, নিয়ন্ত্রণ, অবিশ্বাস, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ বা ক্রমাগত ঝগড়া থাকলে শুধু ভালো সময় কাটানো যথেষ্ট নাও হতে পারে। তখন নিরপেক্ষ পেশাদার দাম্পত্য-পরামর্শদাতার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

এটি দুর্বলতার পরিচয় নয়। শরীরের অসুখে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যেমন স্বাভাবিক, সম্পর্কের অসুখে দক্ষ সহায়তা নেওয়াও তেমনই স্বাভাবিক।তবে শারীরিক সহিংসতা, জবরদস্তি, গুরুতর ভয় দেখানো বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে প্রথম কাজ সম্পর্ক “স্বাভাবিক” করা নয়-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

একজন স্বামীকে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে-“আমি কি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসার মানুষ হিসেবে দেখছি, নাকি নিজের ক্ষমতার অধীন মানুষ হিসেবে?”একজন স্ত্রীকেও প্রশ্ন করতে হবে-“আমি কি ভালোবাসার নামে নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলছি, নাকি সম্মানের সঙ্গে নিজের কথাও বলছি?”কারণ সুস্থ সংসারে একজন জিতবে আর একজন হারবে-এমন নয়।

প্রেমের সময় দুজন মানুষ একে অপরকে বেছে নিয়েছিল। বিয়ের পর সেই নির্বাচন প্রতিদিন নতুন করে প্রমাণ করতে হয়।টাকা দিয়ে নয়।আদেশ দিয়ে নয়।ভয় দেখিয়ে নয়।সম্মান দিয়ে।শুনে।বোঝার চেষ্টা করে।ভুল হলে ক্ষমা চেয়ে।আর প্রয়োজনে নিজেকে বদলে।কারণ সংশোধন তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ সত্যি করে বুঝতে পারে-“আমার স্ত্রী আমার অধীন নয়।আমার স্বামী আমার মালিক নয়।এই মানুষটি আমার পাশে আছে-আমার নিচে নয়।”সেখান থেকেই দাম্পত্য আবার প্রেমের দিকে ফিরতে শুরু করে। বাস্তব নিয়মগুলোর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।

আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন