সেই মায়ার দেশ, সেই কঠিন দেশ - আহমদ মনজুর

সেই মায়ার দেশ, সেই কঠিন দেশ
আহমদ মনজুর
২৫ বছর। এতকাল শুধু স্বপ্নে দেখেছি ঢাকার আকাশ। চোখের সামনে ভেসে উঠত মায়ের শেষ হাসি, যে হাসি আমি শিশুবেলায় থমকে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম। তারপর এক টুকরো স্যুটকেস আর দাদার হাত ধরে নিউ ইয়র্কের কুইন্স—যেখানে ইংরেজি আমার শত্রু ছিল, আর বাংলা ছিল একমাত্র বন্ধু। জ্যাকসন হাইটসের রাস্তায় বড় হয়েছি। সেখানে যেমন ছিল সামোসার গন্ধ, তেমনি ছিল ৯/১১-এর পর উঁকি দেওয়া বিদ্বেষ। আমি শিখেছিলাম বুক চিতিয়ে হাঁটতে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কে জানত, ঢাকার কাঁচা রাস্তায় খেলার বল ছুড়তে ছুড়তে যে ছেলেটা বড় হচ্ছিল, সে-ই একদিন আমেরিকার মেরিন ইউনিফর্ম গায়ে চড়াবে?
আফগানিস্তানের ধুলোয় যখন দাঁড়াতাম, ওখানকার মরুভূমির রোদ আমাকে ঢাকার গ্রীষ্মের কথা মনে করিয়ে দিত। ইউনিটে আমি ছিলাম একমাত্র বাংলাদেশি মুখ। কখনো কখনো ভাবতাম, আমি কি সত্যিই এদের একজন? নাকি আমি এখনও সেই ছেলে, যে রাতে মায়ের জন্য কাঁদে, কিন্তু সকালে নিজেকে শক্ত করে তোলে?
তারপর এলো ২০২৫ সালের ডিসেম্বর। অন্তর্বর্তী সরকারের উত্তাল সময়ে প্রথমবার ঢাকায় পা রাখলাম। ওহ্, কী গন্ধ! পাকা রাস্তার পিচের গন্ধ, ট্রাফিক জ্যামে লম্বা লম্বা হর্ন, আর কোণে কোণে ইফতারের আয়োজন—যেন সময় থেমে গিয়েছিল আমার জন্য। দাদার বাড়ির সেই পুরোনো ঘর। মায়ের হারিয়ে যাওয়া ছবি। যেখানে আমার জীবনের সব 'আগে' শুরু হয়েছিল।
সেদিন বুঝলাম, আসলে আমি কখনোই সম্পূর্ণ আমেরিকান ছিলাম না, আবার সম্পূর্ণ বাংলাদেশিও নই। আমি একটা সেতু। আমার বুকের একপাশে জ্বলে আমেরিকার তারামণ্ডল, আরেকপাশে বয়ে যায় পদ্মার স্রোত।
বাংলাদেশ আমার 'ভিত্তি'—যে মাটিতে আমার শেকড় অদ্ভুতভাবে পুঁতে আছে। আর আমেরিকা আমার 'নির্মাণ'—যে কারিগরি আমাকে দাঁড়াতে শিখিয়েছে।
ফেরার পথে প্লেনের জানালায় যখন আমেরিকার আকাশ দেখি, তখন হঠাৎ চোখে জল এলো। কারণ এবার জানি, আমি ফিরছি একটা বাড়িতে, আবার হারাচ্ছি না আরেকটা বাড়িকে।
এই যন্ত্রণা আর এই ভালোবাসা—উভয়কেই বুকে ধারণ করেই আমার 'আমি' সম্পূর্ণ। আমি সেই বাঙালি, যে মেরিন হয়েও মায়ের কবরে ফুল দেয়; আমি সেই আমেরিকান, যে বাংলাদেশের সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা রাখে।
আমার এই অনুভূতি যেন এক অসমাপ্ত কবিতা—যার শেষ হয় না, কারণ দুই দেশের মাঝে আমার প্রাণটাই আজ স্থায়ী ঠিকানা।
@( মনজুর আহমদ ও রেখা আহমেদ এর নাতি ধ্রুবর লেখা পড়ে)
-
ছবিতে দেখুন






