সমাজ গঠন ও ধর্মীয় জীবনচর্চায় তরুণ সমাজের অবদান ও গুরুত্ব
ইতিহাসের পথপরিক্রমায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও সমাজ গঠনে যুবসমাজ প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে যৌবনকালকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও হিসাবদেয় অধ্যায় হিসেবে গণ্য করা হয়।

মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় অধ্যায় হলো যৌবনকাল। ইতিহাসের প্রতিটি যুগে সব ধরনের অসত্য, অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে তরুণেরাই প্রথম প্রতিবাদমুখর হয়েছেন। বিভিন্ন জাতির মুক্তি এবং সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজের অবদান অপরিসীম। যেমন হযরত ইব্রাহিম (আ.) তরুণ বয়সেই স্বজাতির মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন, যা পবিত্র কোরআনের সূরা ইব্রাহিমের ৬০ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে।
সভ্যতা ও সংস্কৃতির যেকোনো রূপান্তরে যুবকদের অবদান স্পষ্ট। কোরআনে বর্ণিত আসহাবে কাহাফের ধার্মিক ব্যক্তিরাও তরুণ ছিলেন, যাঁদের স্রষ্টা শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেন এবং সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দেন। একইভাবে হযরত মুসা (আ.)-এর দাওয়াতে বনি ইসরাইলদের মধ্য থেকে তরুণ সমাজই প্রথম বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। এছাড়া হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তের প্রারম্ভে ইসলাম গ্রহণকারীদের বড় অংশই ছিলেন ১৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী যুবক। ইমাম ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন যে, মহানবী (সা.)-এর আহ্বানে সাড়াদানকারীদের সিংহভাগই ছিলেন তরুণ।
শৈশব ও বার্ধক্যের মধ্যবর্তী এই সময়টিতে মানুষের শক্তি, বুদ্ধি ও সামর্থ্য চূড়ান্তে পৌঁছায়। শৈশবে শারীরিক দুর্বলতা এবং বৃদ্ধ বয়সে পরনির্ভরশীলতা তৈরি হলেও যৌবনে মানুষ পূর্ণ শক্তি অর্জন করে। সূরা রুমের ৫৪ নম্বর আয়াতে শারীরিক ক্ষমতার এই পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। বুখারি ও মুসলিম শরিফের হাদিস অনুযায়ী, শেষ বিচারের দিনে মহান আল্লাহর আরশের ছায়াপ্রাপ্ত সাত শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যে নিজের যৌবনকাল আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেছে।
যৌবনের আমল ও সৎকাজের গুরুত্ব বার্ধক্যের চেয়ে অনেক বেশি। পরকালে মানুষের জীবনের প্রতি মুহূর্তের হিসাবের সঙ্গে যৌবনকাল কিসে ব্যয় করা হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হবে বলে তিরমিজি শরিফের হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়া হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় জানা যায়, আল্লাহ তাআলা নবীদের প্রাপ্তবয়স্ক যৌবনেই নবুয়ত ও ইলম দান করেছেন। এর উদাহরণ হিসেবে সূরা কাসাসের ১৪ নম্বর আয়াতে হযরত মুসা (আ.)-কে পূর্ণ যৌবনে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দেওয়ার কথা এসেছে।
মুস্তাদরাক হাকিমে বর্ণিত এক হাদিসে বার্ধক্য আসার আগে যৌবনকে এবং মৃত্যুর আগে জীবনকে অমূল্য সুযোগ হিসেবে অনুধাবনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাই প্রত্যেক যুবকের দায়িত্ব হলো নিজেকে পবিত্র রাখা, স্রষ্টার ইবাদতে মন দেওয়া, নবীর আদর্শ অনুসরণ করা এবং সৎকাজের প্রসার ও অসৎকাজ প্রতিরোধের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে কাজ করা।
