সাংবাদিকের কলমকে থামানো যায় না - হাসিনা আকতার নিগার

মতামত ৩০ আগস্ট ২০২৬ ৪৬৬৩
সাংবাদিকের কলমকে থামানো যায় না  - হাসিনা আকতার নিগার

" তোমরা লেখবা, আমরা পিডামু।" - এমন কথা কি নতুন বাংলাদেশের হতে পারে? প্রশ্ন করাটা হয়তো বা অবান্তর মনে হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির ধারাবাহিকতায়।সাংবাদিকদের উপর হামলা মামলা, এমনকি হত্যা নতুন কিছু নয়। কারণ, এ দেশের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থায় সংবাদ ও সাংবাদিক কখনোই স্বাধীন নয়। সাংবাদিকের কলমকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে নাই এমন কোন সরকার অতীতে ও ছিল না আর বর্তমান - ভবিষ্যৎতে হবে না এটা হলফ করে বলা যায়। স্বাধ স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের সাংবাদিকতার কালো আইন থেকে শুরু করে আজ অবধি নানাভাবেই সরকার সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের অবদমন করার চেষ্টা করছে।আর এ পথে চলতে গিয়ে সাংবাদিকরা যে গতিপথ হারিয়েছে তাও অস্বীকার করার কোন জো নেই। বাক স্বাধীনতার বিশেষ একটা স্তম্ভ হলো সংবাদিকদের কলম। সে কলমকে বলেই কি থামানো যায় নাকি কেউ থামাতে পেরেছে।এখন প্রশ্ন হলো, যে কলম নিয়ে সাংবাদিকদের এত অহংকার তার সে কলম কেন রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার কাছে বিক্রি হয়ে যায়। কেন তার দলীয় লেবাস ধারণ করে। উত্তর একটাই - অর্থ আর ক্ষমতার মোহ।

সংবাদপত্র একটি দেশে পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখে জনগণের পক্ষ থেকে। তাই সংবাদপত্রকে বলা হয় সংবিধানের পঞ্চম স্তম্ভ।এখন কথা হচ্ছে যে সংবাদপত্র ও সাংবাদিক দেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, সে মাধ্যমেটি কি সঠিক পথে কাজ করতে পারছে নতুন বাংলাদেশের সময়? ঠিক যতটা আশা করেছিল ততটা নয়।কারণ এ সরকারের আমলে, গণমাধ্যমে এক ধরনের আকাল চলছে বিজ্ঞ সাংবাদিকদের। কারন সবাইকে গনহারে ফ্যাসিষ্টের দোসর বানিয়ে দিয়েছে ইউনুস সরকার থেকে এখন অবধি। তাই বিএনপি সরকার, বিরোধী দল জনগন বনাম সংবাদ মাধ্যম আলোচনাটি এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সাংবাদিকদের দলীয় পরিচয়ের ভয়াবহতা কতটা ভয়ংকর তার প্রমান বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের পূর্বে ও পরবর্তীতে দৃশ্যত। এটা সাংবাদিকদের জন্য যেমন শিক্ষা তেমন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য।

আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ শাসন আমলে সাংবাদিকতায় আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কিছুই ছিল না বলা হয়ে থাকে। এ কথা যে কেবল সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে তা কিন্তু নয়।প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে একই আলাপ। তবে সাংবাদিকতার নীতিজ্ঞান বির্সজন দিয়ে যারা বিত্তশালী হচ্ছে তাদের দিয়ে সব সাংবাদিকদের বিচার করাটা ভুল। যখন একজন মানুষের পেশাই হলো সাংবাদিকতা সেখানে সে পেটের দায়ে বা সংসার পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানের নীতির বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারে না বা করাটা অসম্ভব। বিগত ১৬ বছরে সারা দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া কি আর কিছু ছিল।এখন যেমন বিএনপি ছাড়া কিছু নেই। তাই গনহারে ফ্যাসিষ্টের ট্যাগ লাগিয়ে সাংবাদিকদের চাকরি চ্যুত করা সম্পূর্ণ ভাবে অযৌক্তিক। আবার বিগত সময়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে যখন ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে তখন ব্যবসায়ীরা মিডিয়াকে ব্যবহার করছে তাদের বে- আইনী কাজের অস্ত্র হিসাবে।বিশেষ করে ১/১১ এর পর ব্যবসায়ীরা বুঝতে পেরেছে একটা সংবাদ প্রতিষ্ঠান থাকলে তারা অনেক কিছু থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে।কারণ সংবাদ মাধ্যম তাদেরকে সরকার থেকে সুবিধা নিতে সুযোগ করে দেয়।তাই ১/১১ পর দেশের বহু নামকরা প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থে নামে বেনামে মিডিয়া ব্যবসায় যুক্ত হয়। আর বিগত আওয়ামী সরকার সে সব সংবাদ মাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থে। ব্যবসায়ীরা তাদের সংবাদ পত্র আর টিভি চ্যানেলের পরিচালক, এডিটর হিসাবে নিয়োগ সরকারি দলের সাথে সম্পৃক্ত সাংবাদিকদের। এতে করে উভয় পক্ষের লাভ হয়। কারন প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্তাব্যক্তিটি ব্রীজ হিসাবে কাজ করে সরকার ও ব্যবসায়ীর জন্য। সেখানে কর্মরত অন্য সাংবাদিকরা তাদের কাজটি করে পেশা হিসাবে।অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তারা এখন বিদেশে আছে আর দেশে থাকা ছা-পোষা সাংবাদিকদের চাকরি থেকে গনহারে বিতাড়িত করেছে ইউনুস সরকারের আমল থেকে এখন অবধি ফ্যাসিষ্টের ট্যাগ লাগিয়ে । ব্যবসায়ীরা রাতারাতি নিজেদেরকে বাঁচাতে তাদের মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা তুলে দিয়েছে বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির হাতে। বিগত সরকারের সময়ে যেসব সাংবাদিক আংগুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে তাদের বেশির ভাগই পালিয়ে গিয়ে বিদেশে হয়তো ভালোই আছে।আর যে ক'জন কারাবন্দী আছে তাদের মামলাগুলো কতটা গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে কথা বলা উচিত নয় আইনের বিধি হিসাবে। তবে এ বন্দী সাংবাদিকরা কি করে হত্যা মামলার সাথে যুক্ত সে হিসাবটা মেলানো কঠিন। এ যেমন এত বছর পর বলা হচ্ছে সাগর রুনির মামলার কারণ পাওয়া গেছে। আর তা হল বিডিআর হত্যা সহ সরকারি কাজের নথি পত্র সংক্রান্ত।এটা তো শুনা কথা।মামলার গভীরে গিয়ে সত্যতা আনাটা এতই সহজ হবে না যেমন হচ্ছে না বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুমের বিষয়ে। সাগর রুনির মামলায় তদন্ত এখন কেবল সংখ্যা মাত্র। কেউ ভাবে না একজন সাংবাদিক এমন বিশেষ কোন ব্যক্তির তথ্য প্রমান তুলে যার জন্য তাকে সহ তার পরিবারকে এভাবে শেষ করে দিয়েছে। সাগর রুনির ছেলের এ পৃথিবীতে আপন বলে কেউ নিয়ে। কতটা ক্ষত সে বয়ে বেড়ায়।

সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়ে নিজের কলমকে বিবেকের হাতিয়ার মনে করা খুব সহজ কাজ নয়।আর তাই একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে ভেবে দেখুন, আজ যাদের ফ্যাসিষ্টের ট্যাগ দিয়ে চাকরি কেড়ে নেয়া হয়েছে তারা কি সত্যি সকলে মানসিকভাবে আওয়ামী লীগ সমর্থক ছিল।নাকি জীবনের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে কাজ করেছে। একটা দীর্ঘ মেয়াদি সরকার শুধু রাজনৈতিক ক্ষতি করে না, বরং সবচেয়ে কঠিন ভাবে ক্ষতি করে প্রশাসন, বিচার,সংবাদ মাধ্যমে সহ সকল ক্ষেত্রে। আজ যারা নিজেদের বিএনপি বলে নানা জায়গায় প্রভাব বিস্তার করছে বিগত সময়ে তারা কি কাজ করে নাই নাকি বিগত সময়ের সরকার বিরোধী দল বিএনপি বা অন্যান্য সংগঠন তাদের সংসারের দায়ভার নিয়েছিল। উত্তরটা দেয়া এতটা সহজ নয় বলে সরকার চাইলেও প্রশাসন বা পুলিশ থেকে সহজে সবাইকে সরিয়ে দিতে পারে না আর পারবেও না।অনেকটা সেই প্রবাদের, " লোম বাছতে বাছতে কম্বল উজার হয়ে যাবে।"

তবে বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদের যে চাটুকারিতা নেই তা কিন্তু নয়।সবই একই আছে বলে বিএনপি নেতারা বলতে ,"তোমরা লেখবা,আমরা পিডামু।" এ কথাটা একজন সচেতন সাংবাদিকের কাছে কতটা অপমানজনক তা মনে হয় এ সমাজ দেশ ও সরকার বুঝতে পারে না। আর দলবাজ সাংবাদিকরা এ নিয়ে কথা বলছে না। কারণ বিএনপি থেকে তারাও ফায়দা নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।এসব দেখে মনে হয় না কোন কিছুর পরিবর্তন হয়েছে । কেবল চেহারার বদল হয়েছে বলে মিডিয়াতে চলছে দখলের রাজনীতি আর এ পথে বিএনপি হাঁটছে কিছু তেলবাজ সাংবাদিকদের কথায়। যা সরকার এবং দলের জন্য কতটা ভয়ংকর হয় তার প্রমান থাকা সত্ত্বেও আচরনের পরিবর্তন হয় না। বলা হয়ে থাকে,বর্তমান সরকারের আমলে তথ্য ও গণমাধ্যমে স্বাধীন। আসলে কি তাই? সরকারের সমালোচনা করতে হয় নমনীয় ভাষায়,সত্য কথা লিখলে চলে হুমকি ধামকি। আবার প্রতিটি গণমাধ্যমের কর্তা ব্যক্তি, এডিটরা হলেন বিএনপি পন্থী।তাদের সখ্যতা হলো বিএনপি ঘরানার সাংবাদিকদের সাথে। নিরপেক্ষদের স্থান আগেও ছিল না এখনো নেই।এখানে যে বিষয়টি লক্ষ্যনীয় তা হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার সরকারের তথ্য ও গণমাধ্যমের অবস্থাটা খুব দূর্বল। সেটা প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যাই হোক না কেন। সাংবাদিকদের দলীয়করণ করে ফ্যাসিষ্টের সীলগালা লাগিয়ে বিএনপি নিজের ক্ষতিই করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সাংবাদিকদের কাজের সুযোগ দিতে হবে।তা না হলে সরকারের সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা গড়ে উঠার মাধ্যমে হিসাবে সাংবাদিকরা কাজ করতে পারবে না।আর সে সুযোগে বিএনপির কর্মী নেতারা অযাচিত অশোভন আচরণ করবে সাংবাদিকদের সাথে।

সাংবাদিকতা কোন চ্যারিটেবল জব নয়। সামাজিক দায়বদ্ধতার চিন্তাকে মাথায় রেখে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে যারা বেছে নিয়েছে, তাদের প্রতি সরকারের খেয়াল রাখা দরকার। তবে সে খেয়াল রাখতে গিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের মত আচরণ করা কোন পক্ষের জন্য সমীচীন নয়। গনহারে টিভির অনুমোদন দিয়ে নিজের স্তুতি করার জন্য বাধ্য করেছে। আজ সাংবাদিকদের যে বেহাল দশা তার জন্য বিগত সরকার প্রধান যতটা না দায়ী তার চেয়ে বেশি দায় তেলবাজ সাংবাদিকরা। প্রেসক্লাব থেকে শুরু করে সরকার - বেসরকারি সকল মিডিয়াতে দলীয়করণ। রাজনৈতিক অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু পেশাগত জীবনে এর প্রধান্য থাকা উচিত নয়।প্রেসক্লাব হল সকল সাংবাদিকদের জন্য। অথচ সেখানে রয়েছে দুটি তালিকা। নির্বাচন হয় রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তিতে। সাধারণ মানুষ মনে করে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা হলো সরকারের সংবাদ মাধ্যম। যদিও তথ্যটা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। আধা- স্বায়িত্বশাসিত সংস্থা হলো বাসস। এখানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এতটাই যে, তারাই সংবাদের শিরোনাম হয়ে যায়, তাদের রাজনৈতিক নির্লজ্জতার কারনে।বাংলাদেশ টেলিভিশন আর রেডিও এ ক্ষেত্রে কম যায় না। তাহলে এ ধরনের রাজনৈতিক ধ্যান ধারণা বেষ্টিত বাংলাদেশ তথ্য ও গণমাধ্যমকে কি আসলে স্বাধীন বলা যায়।

দীর্ঘ সময় পর বিএনপি দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। যদিও তারেক জিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন।কিন্তু তিনি দেখেছেন জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার শাসন আমল।আর দল হিসেবে বিএনপিকে ভাবতে হবে তাদের বিগত সময়ের ভুল ত্রুটি নিয়ে। সংবাদজগতে বিএনপির দৈনদশা কাটাতে হলে বিজ্ঞ সাংবাদিকদের যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।আজকল গণমাধ্যম বলতেই সবার সামনে আসে টক-শো। তবে এ সরকারের আমলে চ্যানেলগুলো যে উপস্থাপক নিয়ে বিড়ম্বনায় আছে তা দেখলেই বুঝা যায়।সরকারের প্রেস ইউং বলতে কিছু আছে বলে মনে হয় না।

বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদতায় একটা অস্থিরতা প্রতীয়মান। কারণ মিডিয়ার মালিকরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, কোন পথে তারা হাঁটবে। আর সে অবস্থায় যখন সরকার দল থেকে হুমকি ধামকি চলে তখন তারা আরো নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে চায়। মবের এক ধরনের ট্রমা এখনো মানুষের আছে। সমাজে সাংবাদিক ও পুলিশ এ দুই শ্রেনীকে মানুষ সময়ে ব্যবহার করতেই ভালোবাসে তারপর সবচেয়ে খারাপ গালিটা দেয় এদেরকেই। তাই বলে কি সাংবাদিক ও পুলিশ কাজ করবে না। লেখা বন্ধ করে দিবে? না তা হয় না। একজন সত্যিকারের সাংবাদিক কখনোই দমে যায় না। তাকেই যতই পিটানো হোক কিংবা ফ্যাসিষ্ট বলে গালি দেয়া হোক। লিখতে হবে সমাজ আর দেশের জন্য।এই যে নতুন বাংলাদেশ নিয়ে এত কথা হয়, এ কথাগুলো কি হতো যদি না শেখ হাসিনার অন্যায়ের প্রতিবাদগুলো মিডিয়াতে না আসত। একটা কথা সকলের মনে রাখা উচিত, মানুষকে শেকল পড়ানো যায় কিন্তু বিবেক আর কলমকে নয়।তাই নতুন সরকারকে ভেবে দেখতে হবে ফ্যাসিষ্টের বেড়াজালে সাংবাদিকদের বন্দী করে রাখবে নাকি সমাজের বিবেক হিসাবে কাজ করার সুযোগ দিবে।

আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন