খাল খনন থেকে জলজ বাংলাদেশ: অতীতের শিক্ষা, বর্তমানের বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের উন্নয়ন ভাবনা-নন্দিনী লুইজা

মতামত ২৫ আগস্ট ২০২৬ ৩১০৯
খাল খনন থেকে জলজ বাংলাদেশ: অতীতের শিক্ষা, বর্তমানের বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের উন্নয়ন ভাবনা-নন্দিনী লুইজা

বাংলাদেশকে বুঝতে হলে তার নদীকে বুঝতে হয়। আর নদীকে বুঝতে হলে বুঝতে হয় তার অসংখ্য শাখা-প্রশাখা, খাল-বিল, জলাভূমি ও মানুষের সঙ্গে পানির সেই বহু পুরোনো সম্পর্ককে। এই ভূখণ্ডের কৃষি, জনজীবন, অর্থনীতি, মৎস্য, নৌযোগাযোগ-সবকিছুর সঙ্গে পানি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে ভাবতে গেলে পানি ব্যবস্থাপনা কোনো পার্শ্ববর্তী বিষয় নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের মৌলিক উন্নয়ন-দর্শনের একটি অংশ হওয়া উচিত। এই জায়গা থেকেই বর্তমান সরকারের খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচিকে দেখার প্রয়োজন আছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকার আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল ও জলাশয় খনন বা পুনঃখননের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে বড় একটি উদ্যোগ। এর মধ্যে রয়েছে কৃষির জন্য পানি সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা কমানো, মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার মতো একাধিক লক্ষ্য। এই উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি পরিচিত অধ্যায়ও স্বাভাবিকভাবেই ফিরে আসে-রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কার খাল খনন কর্মসূচি।

তবে ইতিহাসের বিচার করতে গেলে আবেগের চেয়ে সত্যকে বড় করে দেখা জরুরি। বাংলাদেশের খাল ও নদী পুনঃখননের ইতিহাস কোনো একজন রাষ্ট্রনায়কের সময় থেকে শুরু হয়নি। স্বাধীনতার পরপরই দেশের কৃষি, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের সময় সেই খাল খনন কর্মসূচি বৃহৎ পরিসরে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে একটি দৃশ্যমান উন্নয়ন কর্মসূচিতে রূপ নেয়-এটিই তার বিশেষ ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য।

সেই সময়ের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। তখন দেশের অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, কৃষি ছিল প্রধানত প্রকৃতিনির্ভর, সেচব্যবস্থা ছিল সীমিত, গ্রামীণ অবকাঠামো ছিল দুর্বল এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও ছিল কম। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব-দুটি বিপরীত সংকট একই সঙ্গে কৃষিকে প্রভাবিত করত। খাল পুনঃখননের ধারণাটি সেই দুই সংকটের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সেতুবন্ধন তৈরি করার চেষ্টা করেছিল।

একটি খাল বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারে, জলাবদ্ধতা কমাতে পারে, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি সেচে ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে খাল হতে পারে মাছের আবাসস্থল, স্থানীয় নৌযোগাযোগের পথ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি অবকাঠামো।এই বহুমুখী চরিত্রই খালকে শুধুমাত্র একটি জলপথের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

অতীতের খাল খননের সবচেয়ে বড় শিক্ষা

জিয়াউর রহমানের সময়কার খাল খনন কর্মসূচির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। গ্রামের মানুষ নিজেরাই শ্রম দিয়েছে, খাল কেটেছে এবং সেই কাজের সঙ্গে তাদের জীবন ও অর্থনীতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

আজ সেই মডেলকে হুবহু ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন নেই। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, মানুষের জীবনযাপন বদলেছে। কিন্তু সেই মডেলের একটি মৌলিক শিক্ষা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক-যে উন্নয়ন মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে, সেই উন্নয়নে মানুষকে অংশীদার করতে হয়।

বর্তমান সময়ে খাল খনন হবে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে। কিন্তু কোন খাল আগে খনন করা দরকার, কোন খাল কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কোথায় জলাবদ্ধতা বেশি, কোথায় মাছের প্রজননক্ষেত্র আছে, কোথায় খালের দখল হয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর স্থানীয় মানুষের কাছ থেকেই অনেক সময় সবচেয়ে ভালোভাবে পাওয়া সম্ভব।অতএব জনগণকে শুধু প্রকল্পের সুবিধাভোগী নয়, পরিকল্পনা ও তদারকির অংশীদার করা জরুরি।

আজকের বাংলাদেশে পুরোনো ধারণার নতুন প্রয়োজন

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা বরং খাল পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনকে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট, খাল দখল, শিল্পবর্জ্য, কৃষিতে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা আজ একটি জটিল সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বর্ষায় অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়ে আকস্মিক জলাবদ্ধতা ও বন্যা সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে অনেক এলাকায় পানির সংকট দেখা দেয়।অর্থাৎ সেই পুরোনো সমস্যাটিই নতুন রূপে ফিরে এসেছে-

পানি যখন বেশি, তখন সামলানোর জায়গা নেই; আর যখন প্রয়োজন, তখন পানি পাওয়া যায় না।

এই বাস্তবতায় খাল পুনঃখনন অত্যন্ত কার্যকর একটি সমাধানের অংশ হতে পারে।কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক সতর্কতা প্রয়োজন।খাল খননকে যদি শুধু “মাটি কাটার প্রকল্প” হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর সম্ভাবনা নষ্ট হবে।খালকে দেখতে হবে একটি বৃহত্তর জলব্যবস্থার অংশ হিসেবে।নদী, খাল, বিল, হাওর, জলাভূমি, পুকুর, কৃষিজমি, ভূগর্ভস্থ পানি এবং নগর ড্রেনেজ-এসব আলাদা কোনো ব্যবস্থা নয়। এগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত একটি জীবন্ত জলজ নেটওয়ার্ক।সুতরাং আজকের বাংলাদেশে প্রয়োজন সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা।

২০ হাজার কিলোমিটার-সংখ্যার চেয়ে প্রয়োজন ফলাফল

২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় খননের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন করতেই পারি-২০ হাজার কিলোমিটার খনন করলেই কি প্রকল্প সফল হবে?আমার মনে হয়, না।কারণ একটি প্রকল্পের সাফল্য তার দৈর্ঘ্য দিয়ে নয়, তার ফল দিয়ে বিচার করা উচিত।

ধরা যাক, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হলো। কিন্তু কয়েক বছর পর আবার পলি জমে খাল ভরাট হয়ে গেল। তাহলে সেই বিপুল সরকারি অর্থের কতটা স্থায়ী সুফল পাওয়া গেল?অন্যদিকে যদি অপেক্ষাকৃত কম দৈর্ঘ্যের খাল বৈজ্ঞানিকভাবে নির্বাচন করে এমনভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়, যার ফলে কৃষিতে সেচ বাড়ে, জলাবদ্ধতা কমে, মাছের উৎপাদন বাড়ে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমে এবং স্থানীয় মানুষের আয় বৃদ্ধি পায়-তাহলে সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্য।তাই সাফল্যের সূচক হওয়া উচিত—

কত কিলোমিটার খাল খনন হলো-তার পাশাপাশি কত হেক্টর কৃষিজমি উপকৃত হলো, কত মানুষ লাভবান হলো, কতটা পানি সংরক্ষণ করা গেল, কতটা জলাবদ্ধতা কমল এবং কত বছর সেই সুফল টিকে থাকল।এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। সব খাল একইভাবে খননযোগ্য নয়

বাংলাদেশের প্রতিটি খাল তার প্রকৃতি, ভূপ্রকৃতি, পানি প্রবাহ, স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের দিক থেকে আলাদা।কোনো খাল বর্ষায় বন্যার পানি নিষ্কাশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনোটি শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য অপরিহার্য। কোনো খাল মাছের প্রজননক্ষেত্র। কোনোটি শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ। আবার কোনো কোনো খাল নদীর সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে কার্যত মৃত জলপথে পরিণত হয়েছে।

সুতরাং সব খালকে একই নকশায় খনন করা বিপজ্জনক হতে পারে।কোথাও গভীরতা বাড়ানো প্রয়োজন, কোথাও প্রশস্ততা, কোথাও শুধু পলি অপসারণ যথেষ্ট, আবার কোথাও নদী বা অন্য খালের সঙ্গে সংযোগ পুনঃস্থাপনই মূল কাজ।কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গভীর খনন পার্শ্ববর্তী জলাভূমি বা কৃষিজমির স্বাভাবিক জলচক্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।তাই খাল খননের আগে প্রতিটি এলাকার পানিপ্রবাহ, ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশগত বাস্তবতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

একটি জাতীয় খাল মানচিত্র সময়ের দাবি

এই বিশাল কর্মসূচির আগে বাংলাদেশের সব নদী, খাল, বিল ও জলাভূমির একটি আধুনিক ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে।প্রতিটি খালের জন্য থাকা উচিত নিজস্ব তথ্যভান্ডার।কত দীর্ঘ, কত প্রশস্ত, কত গভীর, কোন নদীর সঙ্গে যুক্ত, বর্ষায় কত পানি প্রবাহিত হয়, শুষ্ক মৌসুমে তার অবস্থা কী, কত কৃষিজমি তার ওপর নির্ভরশীল, কোথায় দখল হয়েছে, কোথায় দূষণ রয়েছে, পুনঃখননের আনুমানিক ব্যয় কত এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফল কত-এসব তথ্য এক জায়গায় থাকা প্রয়োজন।

আধুনিক GIS, স্যাটেলাইট চিত্র, ড্রোন প্রযুক্তি ও স্থানীয় তথ্য ব্যবহার করে একটি National Canal and Waterbody Inventory তৈরি করা সম্ভব।তখন খাল নির্বাচন হবে তথ্যের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবের ভিত্তিতে নয়।এটি শুধু বর্তমান প্রকল্পের স্বচ্ছতা বাড়াবে না; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি জাতীয় সম্পদ তৈরি করবে।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।শুষ্ক মৌসুমে কৃষি সেচের জন্য বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি পরিবেশ ও পানিসম্পদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বর্ষার পানি যদি খাল, বিল ও জলাশয়ে ধরে রাখা যায় এবং সেই পানি শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।একই সঙ্গে কৃষকের সেচ ব্যয় কমতে পারে।এখানে খাল খনন কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়-এটি খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতির একটি অংশ।

মৎস্যসম্পদ ও গ্রামীণ অর্থনীতি

বাংলাদেশের খাল-বিলের সঙ্গে মৎস্যসম্পদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক।

অনেক খাল শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রও নষ্ট হয়েছে। আবার কোথাও খাল দখল বা দূষণের কারণে জলজ জীববৈচিত্র্য কমে গেছে।সঠিকভাবে খাল পুনরুদ্ধার করা গেলে স্থানীয় মাছের প্রজনন ও চলাচলের সুযোগ বাড়তে পারে। এতে জেলে পরিবার, গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় বাজার উপকৃত হতে পারে।তবে এখানেও বৈজ্ঞানিক ভারসাম্য প্রয়োজন।খালকে শুধু গভীর করে দিলেই মাছ বাড়বে-এমন ধারণা সঠিক নয়। পানির গুণমান, প্রাকৃতিক উদ্ভিদ, প্রজননক্ষেত্র এবং নদী-খালের সংযোগ-সবকিছুকে বিবেচনায় নিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাংলাদেশে খাল হতে পারে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা

আগামী দিনের বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনকে পাশ কাটিয়ে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়।অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমের পানিসংকট-এসব বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।সঠিকভাবে পরিকল্পিত খালব্যবস্থা অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারে এবং ধীরে ধীরে সেই পানি নিষ্কাশন করতে পারে। আবার শুষ্ক সময়ে সেই পানি কৃষি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যায়।এই কারণে খাল পুনঃখননকে Climate Adaptation Programme হিসেবেও দেখা যেতে পারে।তাহলে এটি শুধু অতীতের কোনো উন্নয়ন ধারণার পুনরাবৃত্তি হবে না; বরং একবিংশ শতাব্দীর জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশের একটি আধুনিক অবকাঠামোতে পরিণত হতে পারে।

শহর ও গ্রামের খালের জন্য একই নীতি নয়

গ্রামের খাল এবং শহরের খালের ভূমিকা এক নয়।গ্রামে খালের প্রধান ভূমিকা হতে পারে সেচ, পানি সংরক্ষণ, মৎস্য ও নিষ্কাশন। শহরে খালের প্রধান ভূমিকা হতে পারে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং নগরের জলধারণ ক্ষমতা বাড়ানো।বিশেষ করে বড় শহরগুলোর খাল দখল ও দূষণমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।কিন্তু শুধু উচ্ছেদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। খালের সীমানা ডিজিটালভাবে নির্ধারণ করতে হবে, নিয়মিত নজরদারি করতে হবে এবং নতুন করে দখল হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। কারণ একটি খাল উদ্ধার করে আবার কয়েক বছর পর দখল হয়ে গেলে সেটি রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় এবং নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের আস্থার সংকট-দুই-ই তৈরি করে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: খননের পর কী হবে-

আমাদের উন্নয়ন সংস্কৃতির একটি দুর্বলতা হলো-নির্মাণে আগ্রহ বেশি, রক্ষণাবেক্ষণে কম।খাল খনন করার পর সেটি কে দেখবে?কত বছর পর পলি অপসারণ হবে?কে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করবে?কে দখল রোধ করবে? এসব প্রশ্ন প্রকল্প শুরুর আগেই উত্তর করা প্রয়োজন।য়প্রতিটি খালের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি Maintenance Plan থাকা উচিত।প্রকল্পের অর্থের একটি অংশ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংরক্ষিত থাকতে পারে। স্থানীয় সরকার, পানি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।কারণ খাল খনন একবারের কাজ; কিন্তু খাল রক্ষা একটি চলমান দায়িত্ব।

স্বচ্ছতা ছাড়া এত বড় প্রকল্প ঝুঁকিমুক্ত নয়

২০ হাজার কিলোমিটার একটি বিশাল কর্মসূচি। স্বাভাবিকভাবেই এতে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হবে।তাই প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।প্রতিটি খালের প্রকল্প ব্যয়, খননের পরিমাণ, ঠিকাদার, মাটি অপসারণের পরিমাণ, প্রকল্পের সময়সীমা এবং বাস্তব সুফলের তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা যেতে পারে।প্রকল্পের আগে ও পরে ছবি, স্যাটেলাইট তথ্য এবং পরিমাপ প্রকাশ করা যেতে পারে।এতে নাগরিকরাও বুঝতে পারবেন-কোথায় কত টাকা খরচ হয়েছে এবং তার বিনিময়ে কী পাওয়া গেছে।একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এটুকু স্বচ্ছতা চাওয়া কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থের যথাযথ ব্যবহারের স্বাভাবিক দাবি।

অতীত থেকে নিতে হবে শিক্ষা, উত্তরাধিকার নয় শুধু

জিয়াউর রহমানের সময়ের খাল খনন কর্মসূচি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা মত রয়েছে। কেউ এটিকে গ্রামীণ উন্নয়নের একটি সফল উদ্যোগ হিসেবে দেখেন, কেউ এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে-সেই সময়ের একটি উন্নয়ন ধারণা থেকে আজকের বাংলাদেশ কী শিখতে পারে?আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন রাষ্ট্রের পরিকল্পনা মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়।

আজ সেই ধারণাকে আরও আধুনিকভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব।তখন মানুষের শ্রম ছিল প্রধান শক্তি। আজ তার সঙ্গে যুক্ত হবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি।তখন লক্ষ্য ছিল কৃষি ও কর্মসংস্থান। আজ তার সঙ্গে যুক্ত হবে জলবায়ু অভিযোজন, পরিবেশ সংরক্ষণ, মৎস্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা।তখন খাল ছিল গ্রামীণ উন্নয়নের একটি হাতিয়ার। আজ খাল হতে পারে জাতীয় জল-অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

একটি নতুন উন্নয়ন মডেলের সম্ভাবনা

বর্তমান খাল পুনঃখনন কর্মসূচিকে চাইলে একটি নতুন জাতীয় মডেলে রূপ দেওয়া সম্ভব।এটি শুধু “খাল খনন প্রকল্প” না হয়ে হতে পারে-

বাংলাদেশের খাল পুনর্জাগরণ ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি। এর মূল উদ্দেশ্য হতে পারে পাঁচটি- পানি সংরক্ষণ,কৃষি উৎপাদন, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ,এবং জলবায়ু সহনশীলতা।

এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে আধুনিক প্রযুক্তি, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন মূল্যায়ন।প্রথম পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন ভূপ্রকৃতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ২০-৩০টি এলাকায় পরীক্ষামূলক মডেল তৈরি করা যেতে পারে। সেখানকার ফলাফল বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পর্যায়ে বৃহত্তর এলাকায় কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হলে ভুলের ঝুঁকি কমবে।এতে হয়তো প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা বেশি সময় লাগবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয় হবে এবং প্রকল্পের স্থায়িত্ব বাড়বে।

একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার কাছে খাল খনন কোনো দলীয় বিষয় নয়।খাল বিএনপির নয়, আওয়ামী লীগের নয়, কোনো সরকারেরও একক সম্পত্তি নয়।খাল বাংলাদেশের।নদী বাংলাদেশের।জলাভূমি বাংলাদেশের।আর এগুলো রক্ষা করা বর্তমান প্রজন্মের যেমন দায়িত্ব, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিও তেমন দায়।তাই অতীতের কোনো সরকার খাল খনন করেছিল কি না, আজকের সরকার সেই ধারণা গ্রহণ করেছে কি না—এই বিতর্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আজকের বাংলাদেশে আমরা পানিকে কীভাবে দেখছি।

যদি খালকে শুধু মাটি কাটার প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এটি হয়তো আরেকটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প হয়ে থাকবে।কিন্তু যদি খালকে কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, নগরজীবন, জলবায়ু, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত একটি জীবন্ত অবকাঠামো হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি বড় ভিত্তি হতে পারে।২০ হাজার কিলোমিটার খনন করা বড় সাফল্য নয়-যদি সেই খাল আবার ভরাট হয়ে যায়।একটি ছোট খালও বড় সাফল্য হতে পারে-যদি তার পানি ধরে রেখে একটি গ্রামের কৃষি বদলে যায়, কয়েকটি পরিবারের আয় বাড়ে, একটি জলাবদ্ধ শহর স্বস্তি পায়, মাছ ফিরে আসে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমে এবং মানুষ আবার তার হারানো জলজ জীবনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।সুতরাং আজকের প্রয়োজন শুধু খাল খনন নয়।

খালের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনর্গঠন-জিয়াউর রহমানের সময়ের কর্মসূচির সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা যদি কিছু থেকে থাকে, তবে তা কোনো রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়; বরং একটি উন্নয়ন-ভাবনা—মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগানো।আজকের বাংলাদেশ সেই ভাবনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারে।পুরোনো খালকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে যদি নতুন প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, পরিবেশগত ভারসাম্য, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং কঠোর জবাবদিহি যুক্ত করা যায়, তাহলে খাল খনন একটি অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে না। এটি হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের একটি নতুন উন্নয়ন মডেল।আর সেই মডেলের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে-এটি কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়।এটি হবে মানুষের বাংলাদেশকে তার পানির সঙ্গে আবার যুক্ত করার একটি জাতীয় প্রয়াস।

আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন