সংখ্যার চেয়ে পাসপোর্টের চ্যালেঞ্জটাই বড়: ১৮৫ বনাম ১৬১-র আসল গল্প
আন্তর্জাতিক ভ্রমণের মানচিত্রে বিশ্বের সব নাগরিকের যাত্রা এক বিন্দু থেকে শুরু হয় না। বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচক যখন আন্তর্জাতিক চলাচলের পথ সহজ বা রুদ্ধ করে তোলে, তখন কিছু ভ্রমণ কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রমের গল্প থাকে না—তা হয়ে ওঠে মানুষের অদম্য ইচ্ছা ও সীমানা অতিক্রমের এক অসাধারণ লড়াই।
সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে বিষয়টি অত্যন্ত গভীরভাবে উঠে এসেছে—একজন সুইডিশ নাগরিক পাসপোর্ট হাতে ১৮৫টি দেশ ভ্রমণ করেছেন, আর অন্যদিকে একজন বাংলাদেশি নাগরিক পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্বজুড়ে ১৬১টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। দৃশ্যত ১৮৫ একটি বড় সংখ্যা। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো—কোন পাসপোর্টের শক্তিতে এই পথ চলা?
সংখ্যার চেয়েও বড় ব্যবধান
২০২৬ সালের হেনলি পাসপোর্ট সূচক অনুযায়ী, সুইডেনের অবস্থান তৃতীয়—যেখানে তাদের পাসপোর্টধারীরা ১৮৭টি গন্তব্যে ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন । অন্যদিকে, বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম (উত্তর কোরিয়ার সাথে যৌথভাবে), যেখানে ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভ ভিসা সুবিধা রয়েছে মাত্র ৩৫টি দেশে ।
এখন প্রশ্ন জাগে—১৮৫ আর ১৬১ এই সংখ্যা দুটি এলো কোথা থেকে? অনুসন্ধানে জানা যায়, সুইডিশ পাসপোর্টধারীরা মোট ১৯৪টি দেশে ভিসা ছাড়াই বা অন-অ্যারাইভ ভিসায় যেতে পারেন । আর বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য এই সংখ্যা মাত্র ৩৫ ।
'১৮৫ বনাম ১৬১' আসলে কী বোঝায়?
এই দুটি সংখ্যা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ভ্রমণসংখ্যা নয়, বরং পাসপোর্টের শক্তি ও বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন। একজন সুইডিশ নাগরিক বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ভিসার ঝামেলা ছাড়াই প্রবেশ করতে পারেন, অন্যদিকে একজন বাংলাদেশিকে বেশিরভাগ উন্নত দেশে যেতে হলে দীর্ঘ ও জটিল ভিসা প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়।
কেন এই বিশাল ব্যবধান?
এই ব্যবধানের মূল কারণ—কূটনৈতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন সূচক। সুইডেনের মতো দেশগুলোর সাথে বিশ্বের প্রায় সব দেশের সুসম্পর্ক রয়েছে, ফলে তাদের নাগরিকরা সহজেই চলাচল করতে পারেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সূচক এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বাংলাদেশের পাসপোর্টের বাস্তবতা
বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা যেসব দেশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন, তার মধ্যে রয়েছে—মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, বার্বাডোস, ফিজি, জ্যামাইকা, সেশেলস, কেনিয়া, রুয়ান্ডা, গাম্বিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ । তবে এগুলোর বেশিরভাগই ভ্রমণ বা ব্যবসার জন্য সীমিত সুযোগ দেয়।
বিশেষ পাসপোর্ট (কূটনৈতিক, অফিশিয়াল) titulares-দের জন্য আরও কিছু সুবিধা আছে—মোট ৩৪টি দেশের সাথে ভিসা ছাড়ার চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের, যার মধ্যে সিঙ্গাপুর, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশও আছে । কিন্তু সাধারণ পাসপোর্টধারীরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
পাসপোর্টের লড়াই: সীমাবদ্ধতা পেরোনোর গল্প
এই বিশাল ব্যবধান সত্ত্বেও, ১৬১টি দেশ ভ্রমণ করা একজন বাংলাদেশির গল্প সত্যিই অসাধারণ—কারণ এটি সম্ভব হয়েছে অদম্য ইচ্ছা, পরিকল্পনা ও প্রতিটি দেশের জন্য আলাদা ভিসা প্রক্রিয়া মোকাবিলার মাধ্যমে। যেখানে সুইডিশ নাগরিক সহজেই যাত্রা শুরু করতে পারেন, সেখানে বাংলাদেশিকে প্রতিটি গন্তব্যের জন্য আলাদা প্রস্তুতি, আবেদন ও অপেক্ষার প্রক্রিয়া পার করতে হয়।
'১৮৫ বনাম ১৬১' আসলে পাসপোর্টের শক্তি ও বিশ্বব্যাপী গতিশীলতার একটি তুলনা। এটি দেখায় যে—ভ্রমণ প্রতিটি মানুষের জন্য সমান সহজ নয়; পাসপোর্টের রঙ ও শক্তি নির্ধারণ করে দেয় কে কতটা স্বাধীনভাবে বিশ্ব ভ্রমণ করতে পারে।
তবুও, ১৬১টি দেশ ভ্রমণ করা বাংলাদেশি সেই ব্যক্তি প্রমাণ করেছেন—সীমাবদ্ধতা যত বড়ই হোক, ইচ্ছা ও সংকল্প থাকলে তা অতিক্রম করা সম্ভব। পাসপোর্ট যতটুকু সুযোগ দেয়, তার চেয়েও বেশি কিছু সম্ভব মানুষের অদম্য ইচ্ছায়—এই হলো '১৮৫ বনাম ১৬১'-এর আসল গল্প।
