তীব্র তাপদাহে দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও অর্থনীতির বড় ক্ষতির ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাংকের মতে, আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশে শ্রমঘণ্টা হ্রাস, ফলন ঘাটতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। কার্যকর অভিযোজন পদক্ষেপ না নিলে বহু মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মুখে পড়তে পারে।

বিগত এক দশকে পৃথিবী জুড়ে ক্রমাগত তাপমাত্রা বাড়ার ধারায় বাংলাদেশও ভয়াবহ তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হচ্ছে। অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া ও শ্রমিকের সামর্থ্য হ্রাস পাওয়ায় দেশের কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পড়াশোনা ও সামগ্রিক অর্থনীতি বহুমুখী সংকটে পড়ছে। খেটে খাওয়া মানুষ, যেমন—দিনমজুর, খেতমজুর, রিকশাচালক ও নির্মাণশ্রমিকদের আয় মারাত্মকভাবে কমছে। পাশাপাশি ফসল উৎপাদন হ্রাস, সেচ ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচ এবং চিকিৎসা ব্যয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় নতুন চাপ ফেলছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে সতর্ক করা হয়েছে যে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে এ দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। ফলে চরম তাপদাহ এখন কেবল আবহাওয়াগত বিষয় নয়, বরং এটি খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে পরিবহন, কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের মতো উন্মুক্ত স্থানে কাজ করা বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন পরিবারগুলোর খাদ্য সংস্থান কঠিন হয়ে উঠছে।
কৃষি খাতেও খরা ও তীব্র উত্তাপের মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। অতিরিক্ত গরমের দরুন ধান, গম, ভুট্টা, শাকসবজি ও ফলের পরাগায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উৎপাদন নেমে যাচ্ছে, ফলে জমিতে সেচের বাড়তি প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এ অবস্থা সামাল দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রযুক্তি, আইওটিভিত্তিক মৃত্তিকা পর্যবেক্ষণ, পানিসাশ্রয়ী পদ্ধতি এবং উত্তাপসহনশীল শস্যের উদ্ভাবন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের দেওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করা না গেলে ২০৫০ সাল নাগাদ কেবল রাজধানী ঢাকায় ক্ষতি হবে প্রায় ৭ লাখ ৮ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ। ২০৮০ সালে এটি বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের সমান, যার ফলে তাপের কারণে কর্মঘণ্টা ধ্বংসের হার দাঁড়াবে ৭.৪ শতাংশ। এ ছাড়া বয়স্ক, শিশু, গর্ভবতী নারী ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের হিট স্ট্রোক, হৃদরোগ ও কিডনির সমস্যার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিও তীব্র রূপ নিচ্ছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলাশয় ভরাট করে নির্মিত কংক্রিটের কারণে শহরাঞ্চলে 'হিট আইল্যান্ড' তৈরি হচ্ছে, যা সার্বিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। অপর্যাপ্ত বায়ুচলাচলযুক্ত বাসস্থানে বসবাসকারী নিম্নআয়ের মানুষেরা এ তাপপ্রবাহের ফলে একই সঙ্গে আয়হীনতা ও বাড়তি চিকিৎসাব্যয়ের শিকার হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জাতীয় পর্যায়ে হিট অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি, নগরে সবুজায়ন বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, স্থানীয় সতর্কীকরণ জোরদার এবং গবেষণা ও স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অভিযোজন কৌশলে জোর দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
