ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুব আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার উত্তাল পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ড। রাজ্যের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে রাঁচিতে দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো অবস্থান, মিছিল ও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন চাকরিপ্রার্থীরা। ঝাড়খণ্ডের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছে নয়াদিল্লির বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। ফলে দুটি আন্দোলনকে এখন আর পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে দুর্নীতি, সীমিত চাকরি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাহীনতা মিলিয়ে ভারতের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে জমতে থাকা ক্ষোভের ধারাবাহিক প্রকাশ হিসেবেই এগুলো সামনে আসছে।
গত ৫ জুলাই ১৪তম ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (জেপিএসসি) প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই বিতর্ক শুরু হয়। মূল্যায়নে অসংগতি, ভুল উত্তর, কাট-অফ নম্বর প্রকাশ না করা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগ তোলেন চাকরিপ্রার্থীরা। পরে জেপিএসসি ও ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের অন্যান্য পরীক্ষাও আন্দোলনের দাবির মধ্যে যুক্ত হয়। রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে ২৯ জুলাই থেকে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান চলছে। বুধবার শত শত শিক্ষার্থী বৃষ্টির মধ্যেই সেখান থেকে আলবার্ট এক্কা চত্বর পর্যন্ত জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল করেন। বিতর্কিত পরীক্ষাগুলো বাতিল, কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো থেকে তদন্ত এবং রাজ্যের নিয়োগব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সংস্কার দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনের চাপে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রতিনিধিদল পাঠাতে সম্মত হলেও আলোচনা গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে এবং সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর সাথে করার শর্ত দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, আগের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের প্রতিশ্রুতিগুলো আলোর মুখ দেখেনি।
তাই এবার আশ্বাস নয়, প্রকাশ্য জবাবদিহি চান তারা। অন্যদিকে রাজ্য সরকার জানিয়েছে, এরই মধ্যে এঘটনায় সিআইডির তদন্ত চলছে। জড়িতদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। বুধবার রাজ্য পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা টিডিপিএলের হিসাবরক্ষক রক্ষকসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলায় সিআইডি আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। সব মিলিয়ে এ ঘটনায় অন্তত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিশেষ তদন্তকারী দল ডিজিটাল রেকর্ড, আবেদনসংক্রান্ত তথ্য ও অন্যান্য নথি পরীক্ষা করছে। ঝাড়খণ্ডের আন্দোলনের আগে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অন্যস পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর ফল বাতিল করা হয়েছিল।
২০ জুলাই কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী পার্লামেন্ট অভিমুখে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয়। আন্দোলনটি শুরু করেছিল ককরোচ জনতা পার্টি। পরে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি ছাড়িয়ে বড় যুব আন্দোলনে রূপ নেয়। বিক্ষোভের চাপের মধ্যে ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। কেন্দ্র পরীক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য কমিটি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলায় কঠোর শাস্তি এবং কিছু আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপের কথাও জানায়। দিল্লির আন্দোলনে দৃশ্যমান সাফল্য পাওয়ার পর এবার ঝাড়খণ্ডের আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি। এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেছেন, সংগঠনের সদস্যরা ঝাড়খণ্ডে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সমর্থন করবেন। একই সাথে তিনি জানিয়েছেন, সিজেপি আপাতত নির্বাচনী রাজনৈতিক দল নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি জনচাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করতে চায়। এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সিজেপি সরাসরি ভোট চাইছে না, কিন্তু বিভিন্ন রাজ্যের শিক্ষা ও চাকরিসংক্রান্ত ক্ষোভকে একই প্রতীকের নিচে আনার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ এটি রাজনৈতিক দলের বিকল্প না হলেও রাজনৈতিক আলোচ্যসূচি নির্ধারণের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
