ঢাকার গরম বিকেলে ফুটপাতের ভিড় ভেঙে পার হতে গিয়ে রিয়া আটকে গেল এক মুহূর্তে।
দুই বাস দুপাশ থেকে এসে তাকে চাপা দেবে-ঠিক ঐ সময়েই আরিয়ান দৌড়ে গিয়ে তার হাত টেনে তুলে নিল বাসে।
রিয়া হাঁফাতে হাঁফাতে বলল-আমি পারতাম!
-আমি পারতাম না চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকতে, আসিয়ানের কথায় রিয়া থামল, তাকাল-যেন তার সামনে এক অসম্ভব প্রশ্ন চিহ্ন দাঁড়িয়ে আছে।
ধীরে বলল, এমন মানুষ শহরে এখনো আছে?
এই ছোট বাক্য থেকেই-
দুইজনের অচেনা ভুবনে প্রথম আলোটা জ্বলে উঠেছিল।
কিছু সপ্তাহ চলে গেল যে যার মতো, এই ব্যস্ত শহরে কে কার খোঁজ রাখে। কিন্তু প্রকৃতি আপন খেলায় মত্ত।
দুইজনের জীবন অদ্ভুত গতিতে জড়িয়ে যায়।
হঠাৎ ক্যাম্পাসে কফি শপে দেখা,চেনা চেনা লাগে, কোথায় যেন দেখেছে রিয়া.. ভাবতে থাকে অল্প সময়ের মধ্যে মনে পড়ে সেই দিনের কথা, ঐদিন এই ছেলেটাই জীবন বাঁচিয়েছে। তাই সময় নষ্ট না করে এগিয়ে গিয়ে পরিচয় দিয়ে আবারও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করল রিয়া। এতে আরিয়ান বেশ লজ্জা পেলো। সেই দিন বেশ অনেক সময় ধরে
রাতের আড্ডায় মেতে ছিল দুইজন। এভাবেই তাদের মাঝে মাঝে দেখা হয়, কথা হয় নিজেদের মধ্যে- দেশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান বিষয় এমন কি রাজনীতির আলাপ বাদ যায় না।
রাস্তার ধারে ভুট্টা খেতে খেতে শহরের স্বপ্ন নিয়ে কথা বলা-
দুজনের হাসি–রাগ–বিতর্ক সবকিছুতেই
একধরনের টান, ঝড়, অদৃশ্য রসায়ন।
রিয়া বলতো- জানো, প্রেমে পড়া আমার প্ল্যান ছিল না।
আরিয়ান বলতো- প্রেম কখনো প্ল্যান ফলো করে না। বিষয়টা হলো দুজনের বোঝাপড়া, মানসিকতা আর একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা সবকিছু মিলিয়ে নর- নারী প্রেমে পড়ে। এটা কখনো ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না, বিষয়টা অনেকটা দৈবিক ঘটনা।
কিন্তু বাঙালি সমাজে এখনো প্রেম বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনা। কখনো ছেলের বাড়ি থেকে সমস্যা সৃষ্টি করে অথবা কখনো মেয়ের বাড়ি থেকে সমস্যা সৃষ্টি করে। খুব কম পরিবারে দেখা গেছে প্রেমের বিষয়টা দুই পরিবার খুব আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে।ফলে সমস্যা আসতে বেশি সময় লাগল না।
রিয়ার পরিবার চায় সে বিদেশে উচ্চশিক্ষা করুক,
তার যেন ক্যারিয়ার নষ্ট না হয়।
আরিয়ান সাধারণ মধ্যবিত্ত-বড় স্বপ্ন আছে, কিন্তু বড় প্রভাব নেই।
রিয়ার মা একদিন বললেন-সম্মান করি তোমাদের অনুভূতিকে,কিন্তু আমাদের মেয়ের ভবিষ্যতের সঙ্গে ঝুঁকি নিতে পারি না।
আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন
-তুমি কি তাকে আজই নিরাপত্তা দিতে পারবে?
আজই তার জীবন বদলে দিতে পারবে?
আরিয়ান চুপ করে রইল।
তার নীরবতাই ছিল সম্পর্কের প্রথম ভাঙার শব্দ।
এর মাঝে অনেক সময় চলে যায়।
রিয়া স্কলারশিপ পেল।
লন্ডনে একটা দামী বিশ্ববিদ্যালয়ে,বিজ্ঞানের ছাত্রী। এই সুযোগ বারবার আসে না। আরিয়ান রিয়া কে উৎসাহিত করছে, তার নিজস্ব আকাশে উড়বে নানান উৎসাহ দিচ্ছে আরিয়ান।যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসছে, রিয়া আরিয়ান কে অভয় দিয়েছে, চিন্তা না করতে।যাওয়ার আগেই রিয়া নিজের আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করে এসেছে। আজকে দুজন নিজেদের মধ্যে যাওয়ার আগে বসবে।তাই নদীর ধারে বসার কথা আগেই বলে রেখেছিল।তাই বিদায়ের আগে তারা দুজন বসেছিল নদীর ধারে।
ঢাকার বাতাসে সেদিন অদ্ভুত ভার।
রিয়া বলল-
আমরা কি খুব বেশি আশা করেছি?
না। আমরা কেবল ভালোবেসেছি।
কিন্তু আমরা দুজন দুই পৃথিবীর মানুষ।
তাহলে?
তাহলে একসাথে থাকা সবসময় সম্ভব হয় না।
আরিয়ান বলল—
তুমি গেলে আমি একা হয়ে যাব।
রিয়া দীর্ঘ শ্বাস টেনে বলল—
আমি না গেলেও তুমি একদিন একা হয়ে যেতে।
আমরা দুজনই প্রেমকে ভীষণ শক্ত করে ধরেছি,
কিন্তু সময়… সময়কে কখনো কেউ আটকাতে পারে না।
বিমানবন্দরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে রিয়া হঠাৎ থেমে আরিয়ানের দিকে তাকাল।
তার চোখে পরিষ্কার জল, আর ঠোঁটে একদম ক্ষুদ্র হাসি।
জানো,
তোমার সঙ্গে একটুখানি বেশি সময় কাটাতে পারলে-
হয়তো সব সিদ্ধান্ত বদলে যেত।
আরিয়ান মুখ ফিরিয়ে চোখ মুছে নিল।
তুমি গেলে কি আমি তোমাকে ভুলে যাবো?
না। তুমিও পারবে না, আমিও পারব না।
এটাই আমাদের অভিশাপ,
এটাই আমাদের সৌন্দর্য।
রিয়া ধীরে বলল—
আমরা দুজনই ঠিক মানুষ ছিলাম,
কিন্তু সময়ে একসাথে ছিলাম না।
একটা সেকেন্ড—
শহরের শব্দ থেমে যায়।
বিশ্ব থেমে যায়।
তারপর—
রিয়া ঘুরে চলে যায়।
আরিয়ান বলে না—
"যেও না"
বা
"থেমে যাও"
কারণ সে জানে, রাখা যায় না এমন মানুষকে ধরে রাখার চেষ্টা করাই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
এক বছর পর-
লন্ডনের একটি ক্যাফেতে বসে রিয়া লিখে পাঠালো—
“কখনো মনে হয়…
যদি আমাদের দেখা একটু পরে না হয়ে
একটু আগে হতো…
তাহলে কি আমরা একসাথে থাকতে পারতাম?”
আরিয়ান অন্ধকার ঘরে বসে এই মেসেজ দেখে নিঃশব্দে হাসল।
একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে লিখল—
“হয়তো পারতাম।
কিন্তু এখন আর কিছুই পারব না।
ভালো থেকো, রিয়া।”
সেন্ড করার আগে তার হাত কেঁপে উঠলএকটু, মাত্র একটা সেকেন্ডের জন্য মনে হলো—
"আরও একটু এগিয়ে গেলে হয়তো সব বদলে যেত।"
কিন্তু সে পাঠিয়ে দিল।
রিয়া দেখল,
চোখ বন্ধ করল,
হৃদয়ের কোথাও গভীর ছুরিকাঘাতের মতো এক দংশন-
সম্পর্ক না ভাঙার ব্যথা নয়,
সম্পর্ক ধরে না রাখতে পারার ব্যথা।
দুজনেই বেঁচে রইল।
নিজ নিজ জীবনে।
কিন্তু এই আফসোস-
যেন এক স্থায়ী তিলক।
এই প্রেম কোনওদিন পূর্ণ হলো না,
কিন্তু অপূর্ণতার কারণে
তাদের জীবনভর বেঁচে রইল।
দশ বছর পর ঢাকার এক বৃষ্টিভেজা শীতের সন্ধ্যা।
আরিয়ান অফিস থেকে বের হয়ে বেইলি রোডের একটি ছোট ক্যাফেতে ঢুকল-
চিরাচরিত অভ্যাস,
চা আর এক ঘণ্টা নীরবতা তার দিনের শেষ ক্লান্তি মুছে দেয়।
ক্যাফে ভেজা কাঁচে হালকা বাষ্প জমেছে।
ভেতরে মৃদু আলো, সুমধুর পুরোনো গান,
এমন সময়েই দরজা খোলার শব্দে আরিয়ান মাথা তুলল।
সে দেখতেঢুকল, একজন ভদ্র মহিলা
দরজায় দাঁড়িয়ে, চেনা চেনা লাগছে,একবার দেখে আর দেখছে না কেহ যদি দেখে ফেলে আমি মহিলার দিকে তাকাচ্ছি।তারপরও মন মানে না আবার একটু দেখা মনে হচ্ছে উনি অতি পরিণত জন। ঠিক তাই-
দশ বছর আগেকার সেই রিয়া?
না- সময় তাকে বদলে দিয়েছে।
চুলে হালকা সাদা রেখা,
চোখে পরিণত শান্তি,
ঠোঁটে ক্লান্ত অথচ ভদ্র হাসি।
কিন্তু চোখের ভেতরের সেই আলো-
যা একদিন আরিয়ানকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল—
তা ঠিক একই আছে।
রিয়াও তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, সে ঠিক চিনতে পেরে ধীরে এগিয়ে এল।
-আরিয়ান?
আরিয়ানের বুকের ভেতর যেন কেউ মৃদু হাতুরির আঘাত মারল।
দশ বছর ধরে নামটি শুধু স্মৃতিতে ছিল!
আজ বাস্তবে শুনে তার শরীর কেঁপে উঠল।
-রিয়া… তুমি?
রিয়া হেসে বলল-
শহরে এসেছি ক’দিনের জন্য। ভাবিনি তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে।
তারা দুজন মুখোমুখি বসল।
দুটো কাপ চা এল—
আরিয়ান না চাইলেও অর্ডার দিয়ে ফেলেছিল।
রিয়া চা তুলে নিয়ে বলল—
এখনো চা-ই তোমার প্রিয়?
—হ্যাঁ।
দুজনেই চুপ।
চায়ের ধোঁয়া দুজনের মাঝে উঠছে—
ঠিক যেন তাদের অসমাপ্ত কথাগুলো আবার জন্ম নিচ্ছে।
রিয়া বলল—
আমি বিয়ে করেছি। শান্ত, নরম গলায়।
বলার মতো কোনো অনুভূতি ছিল না তাতে।
একটা তথ্য জানানোর মতো।
আরিয়ান একটু হাসল—
জানি।
জানো?
ফেসবুকে একবার দেখেছিলাম। এরপর দেখিনি।
দেখো না কেন?
কারণ দেখলে ভালো লাগত না।
রিয়া মাথা নিচু করল।
অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা দুজনের মাঝে ঝুলে থাকল।
—তুমি? বিয়ে করেছ?
—না।
—কেন?
—হয়নি।
রিয়া তার চোখের গভীরে তাকাল।
—হয়নি, না তুমি হতে দাওনি?
আরিয়ান উত্তর দিল না।
আরিয়ানও তার সত্য জানাল।
তোমার চলে যাওয়ার পর কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।
তারপর সময় কেটে গেছে।
হয়তো… আমি কাউকে আর জায়গা দিতে পারিনি, তোমার পর।
রিয়া চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত।
তার চোখের কোণ একটু ভিজে উঠল!
যা রিয়া চায়নি আরিয়ান দেখুক,
তবু লুকাতে পারল না।
রিয়া চা রেখে বলল—
জানো, মাঝে মাঝে রাতে মনে হতো…
যদি আমরা একটু বেশি লড়তাম?
যদি আরও জেদী হতাম?
যদি সময়টাকে হারাতে না দিতাম?
আরিয়ান ধীরে বলল—
তাহলে গল্পটা অন্যরকম হতো।
হতো… কিন্তু হলো না।
রিয়া হঠাৎ বলল—
আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছ?
আরিয়ান একটু থেমে বলল—
ক্ষমা করতে পারিনি।
তাহলে?
ভুলতেও পারিনি।
রিয়া মৃদু হাসল।
এই হাসিটা ব্যথায় ভরা,
কিন্তু ভিতরে প্রচণ্ড শক্ত।
রিয়া বলল—
আমি সুখে আছি। এটা সত্য।
কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়—
আমার একটা অংশ কোথাও আটকে আছে…
তোমার কাছে, দশ বছর আগে।
আরিয়ান মৃদু গলায় বলল—
আমি ভালো আছি।
কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়—
আমার একটা অংশ এখনও অপেক্ষা করে…
যে দরজাটা তুমি দশ বছর আগে পার হয়েছিলে,
সেখানেই দাঁড়িয়ে।
দুজনেই হেসে ফেলল!!
একদম শুকনো, নিঃসঙ্গ, বাস্তব হাসি।
রিয়া উঠল।
আমাকে যেতে হবে।
জানি!
আরিয়ান…
হ্যাঁ?
—তুমি যদি তখন বল তে, “থাকো”!!!
আমি থাকতাম।
আরিয়ান চোখ বন্ধ করল।
যেন সব হাওয়া থেমে গেল।
আমি জানতাম না তুমি শুনতে।
আমি শুনতাম।
—কিন্তু তখন তুমি বলোনি।
—হ্যাঁ… বলিনি।
এটাইতো আমাদের ভুল।
এটাই আমাদের আফসোস।
রিয়া তার দিকে চোখে চোখ রেখে তাকাল।
দশ বছর আগের সেই চোখ—
আজ আরও গভীর, আরও তীক্ষ্ণ।
আরিয়ান… বিদায়।
বিদায়, রিয়া।
এই একবারই বলছি…
ভালো থেকো।
রিয়া দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
তার অবয়ব ভিজে কাঁচের ওপারে ঝাপসা হয়ে গেল।
আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল,
তার দিকে তাকিয়ে।
মনে মনে বলল—
“আরও একটূ ডাকলে…
হয়তো আজও ফিরতে পারতো।”
কিন্তু সে ডাকে না।
কথা বলে না।
কারণ দশ বছরের নীরবতা!!!
প্রেমের থেকেও শক্ত দেয়াল।
ক্যাফের শেষ আলো নিভে এল।
টেবিলে দুটো চায়ের কাপ—
একটা খালি, একটা অর্ধেক।
দুটো গল্পের মতো-
একটা পূর্ণ হয়নি,
একটা শেষই হয়নি।
আরিয়ান কাঁচের বাইরে তাকাল।
রিয়া আর নেই।
শুধু বৃষ্টির ভেজা রাস্তা
আর তীব্র, নিঃশব্দ আফসোস।
দুজনেই মিলল না,
তবুও দুজনেই সারাজীবন একে অপরকে বহন করবে।
অনেকটা রোমিও–জুলিয়েটের মতো-
মৃত্যু নয়,সময় তাদের আলাদা করেছে।
