প্রিয় তারেক রহমান ভাই,
আপনি যেন গতানুগতিক না হন—এই প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করছি। দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন শেষে আপনি দেশে ফিরেছেন একজন পরিণত ও পরিপক্ব রাজনীতিবিদ হিসেবে। প্রতিটি বক্তব্যে আপনার শব্দচয়ন যেন পরিমিত ও সুচিন্তিত। রাজনীতির অঙ্গনে অন্যদের প্রতি কোনো অশালীন কথা আমি আপনার মুখ থেকে শুনিনি। বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে, উন্নত হয়েছে, কিন্তু দেশাত্মবোধক অনুভূতি ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি চোখে পড়ে।
তবে আপনি যেন এক ব্যতিক্রম। আপনি যেন এক সৃষ্টির আলোকবর্তিকা। বিশেষ দিনে দেশের মাটিতে এসে আপনি কপাল ছুঁয়ে দেশের জন্য প্রতিজ্ঞা করলেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর আপনার অসাধারণ ভাষণ শুনে আমরা অনেকেই অবাক হয়েছি—এমন ভাষণ সত্যিই একজন পরিপক্ব রাজনীতিবিদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত। আপনার সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি। প্রায় সোয়া তিন দশক আগে ঢাকায় আমি বিবিসির স্ট্রিংগার, সাপ্তাহিক বিচিত্রার কূটনৈতিক সংবাদদাতা এবং নিউ ইয়র্কের সাপ্তাহিক ঠিকানার বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতাম।
এরশাদের পতনের পর আপনার মায়ের বিশেষ সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম গুলশানের বাসায়। ফটোগ্রাফার নূর উদ্দিন ভাইয়ের মোটরসাইকেলে চড়ে। আপনার মায়ের সেই রাজকীয় ব্যক্তিত্ব ও অসাধারণ আন্তরিকতা আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। তারপর নির্বাচন এবং সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের কথাও মনে পড়ে এতদিন পরেও। তখন আমার পরম শ্রদ্ধেয় ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আব্বাস ভাই (মির্জা আব্বাস) মেয়র হিসেবে অসাধারণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। এমনকি তোফায়েল আহমেদ ভাই একদিন বলেছিলেন, "মির্জা আব্বাস মেয়র হিসেবে খুব ভালো করছে।" তখন আবদুল আউয়াল মিন্টু ভাইয়ের অফিসে তাঁর সঙ্গে দেখা হতো।
আপনার সঙ্গে কখনো আলাপ হয়নি—আপনি তখন ছিলেন তরুণ, প্রাণবন্ত পোলাপাইন। জানতাম, আপনি ব্যস্ত থাকতেন হাওয়া ভবন নিয়ে। এরপর অনেক দিন আমি প্রবাসী। বিবিসির সেই কাজ ইতি টানতে লন্ডনের বুশ হাউসে গিয়েছিলাম, তখনো বেঁচে ছিলেন কিংবদন্তি সিরাজুর রহমান। সময় গড়ানোর পর আপনাকে নিয়ে কত অবিচার, অপমান, অত্যাচার দেখেছি দূর প্রবাস থেকে। আপনার মহিয়সী মা ও প্রধানমন্ত্রীর (বেগম খালেদা জিয়া) সঙ্গে দেখা হয়েছিল এই নিউ ইয়র্কেই। তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব কাছ থেকে দেখে আবারও অবাক হয়েছি। এই অসাধারণ ও অনবদ্য মৃদুভাষী মানুষটিকেই আমরা দেখলাম কী অমানবিক আচরণের শিকার হতে।
আপনি গত বছর ঐতিহাসিক ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরলেন আপনার মাকে শেষ দেখার জন্য। তাঁর মহাপ্রয়াণে বাংলাদেশে এবং সারা বিশ্বে যেভাবে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে, তা ইতিহাসে অভূতপূর্ব। আপনি অনেক ভাগ্যবান। আপনার বাবা যেদিন শহীদ হন, সেদিন আমি রেডিও বাংলাদেশের শাহবাগের স্টুডিওতে ছিলাম। রাস্তায় নেমে দেখেছিলাম নীরব শোকের সাগর। তাঁকে নিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ঐতিহাসিক জানাজা আজও আমার স্মৃতিতে ভাস্বর। তারেক রহমান, আপনি একটি অসাধারণ ছোট্ট পরিবারের পুরোধা। অত্যন্ত ডিগনিফাইড স্ত্রী এবং একটি আরাধ্য মেয়ের বাবা আপনি।
আপনার জন্য বাংলাদেশ মৌলবাদীদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে—এ অনুভূতি আমাদের। নির্বাচন নিয়ে দেশে ও প্রবাসে আমরা সবাই গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় ছিলাম। সারারাত জেগে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের লাইভ দেখেছি, অবাক হয়েছি মিডিয়ার এত সাহস ও অগ্রগতি দেখে। বহু বছর পর এমন একটি নির্বাচন দেখলাম, মানুষের কী উৎসাহ ও উদ্দীপনা! নির্বাচন শেষে খবর দেখে মনে হলো, আমাদের সোনার বাংলা, প্রাণের দেশ এই যাত্রায় মৌলবাদীদের হাত থেকে রেহাই পেল। প্রবাসীদের তীর্থক্ষেত্র নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে গিয়ে প্রথম মিষ্টি খেলাম প্রবীণ সাংবাদিক কাজী মন্টু ভাইয়ের অফিসে এবং এলাকাবাসী সোসাইটির প্রেসিডেন্ট সাকিল মিয়ার অফিসে গিয়ে সবাই মিলে আলাদিনের মিষ্টি খেয়ে মৌলবাদীদের প্রতি ধিক্কার জানালাম।
তারেক রহমান, আপনি আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট, তাই আপনাকে জনাব বা হুজুর বলে সম্বোধন করছি না, ভাইয়ের মতোই বলছি। আর মাত্র দুদিন পর আপনি হবেন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেবেন। আপনাকে নিয়ে আমাদের অন্যরকম প্রত্যাশা। অত্যন্ত ভেবেচিন্তে, সময় নিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ নেবেন, ডাবল চেক করবেন। আমাদের সাংবাদিকতার জগতে সেই 'সেম ওল্ড সেম ওল্ড' দৃশ্য দেখতে চাই না। টিভির পর্দায় তাকিয়ে একই চিত্র দেখতে চাই না। আপনি যেন ডিফারেন্ট হন। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আপনি শ্লোগান-মিছিল না করে শুক্রবার দোয়ার যে আহ্বান জানিয়েছেন, সেটি চমৎকার আইডিয়া।
তারেক রহমান, সারা বিশ্ব আপনার দিকে, বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। নতুন কিছু করুন, ব্যতিক্রম হোন, দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। আমি একজন অতি সাধারণ সাংবাদিক ও লেখক। বহু বছর ভয়েস অব আমেরিকার জন্য কাজ করেছি, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তা বন্ধ করে দিয়েছে। ইদানীং 'কফি উইথ কিরন' নিয়ে আছি, সাদামাটা জীবনযাপন করছি। আশা করি বিশ্বের রাজধানী নিউ ইয়র্ক শহরে আপনার সঙ্গে দেখা হবে।
ধন্যবাদান্তে,
আকবর হায়দার কিরন
