জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে? আট প্রার্থীর লড়াইয়ে এগিয়ে রেবেকা গ্রিনস্প্যান, ইতিহাসের প্রথম নারী মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনা

আন্তর্জাতিক ২১ আগস্ট ২০২৬ ৪৭০০
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে? আট প্রার্থীর লড়াইয়ে এগিয়ে রেবেকা গ্রিনস্প্যান, ইতিহাসের প্রথম নারী মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনা

শিব্বীর আহমেদ, জাতিসংঘ, নিউইয়র্ক: জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন—এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। ফলে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে জাতিসংঘের নেতৃত্বে কে আসবেন, তা নিয়ে নিউইয়র্কের কূটনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে জোর তৎপরতা।

ইতোমধ্যে পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে আটজন প্রার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান, গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট, আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি, চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেত, ইকুয়েডরের মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা ও ইভন বাকী, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাকি সাল এবং উগান্ডার সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ওলার ওতুনু।

প্রথম দফার ভোটে এগিয়ে গ্রিনস্প্যান

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য ৩০ জুলাই প্রথম অনানুষ্ঠানিক ‘স্ট্র পোল’-এ অংশ নেন। এই ভোট কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচন নয়; বরং কোন প্রার্থীর প্রতি কতটা সমর্থন বা আপত্তি রয়েছে, তা বোঝার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে গোপন মতামত যাচাই। প্রথম দফার ফলাফলে কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান ১০টি ‘এনকারেজ’ বা উৎসাহসূচক ভোট পেয়ে প্রথম অবস্থানে ছিলেন। গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট পান ৯টি এবং আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি পান ৭টি।

তবে এই ফলাফলকে চূড়ান্ত নির্বাচনী ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি প্রার্থীদের প্রাথমিক অবস্থান সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। আজ, ২১ আগস্ট, নিরাপত্তা পরিষদ দ্বিতীয় দফার অনানুষ্ঠানিক ‘স্ট্র পোল’ করছে। দ্বিতীয় দফার ভোটের মাধ্যমে প্রার্থীদের অবস্থানে পরিবর্তন আসে কি না, সেদিকেই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর।

কে এই রেবেকা গ্রিনস্প্যান?

প্রথম দফার ভোটে এগিয়ে থাকা রেবেকা গ্রিনস্প্যান কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা UNCTAD-এর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থনীতি, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর প্রার্থিতার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো—নির্বাচিত হলে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রায় ৮০ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী মহাসচিব হবেন তিনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রিনস্প্যানকে একজন ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রার্থী (continuity candidate) হিসেবেও দেখা হচ্ছে—অর্থাৎ জাতিসংঘের বর্তমান বহুপাক্ষিক কাঠামোর সঙ্গে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে।

শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট

প্রথম দফার ভোটে মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট। গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমানে জাতিসংঘে দেশটির স্থায়ী প্রতিনিধি রদ্রিগেস-বিরকেটের প্রার্থিতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ক্যারিবীয় অঞ্চলে। তাঁর নির্বাচিত হওয়া হলে তিনি শুধু জাতিসংঘের প্রথম নারী মহাসচিবই নন, ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রথম মহাসচিবও হবেন। জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং ছোট রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থকে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে নিয়ে আসার ওপর তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

রাফায়েল গ্রোসি—আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী

প্রথম দফার ভোটে তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন আর্জেন্টিনার রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি। তিনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা—IAEA-এর মহাপরিচালক। পারমাণবিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সংকট এবং যুদ্ধকালীন কূটনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা তাঁকে অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা অবস্থানে রেখেছে। ইউক্রেন ও ইরানের মতো জটিল আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তাঁর সরাসরি কূটনৈতিক ভূমিকা রয়েছে। প্রথম স্ট্র পোলে সাতটি ‘এনকারেজ’ ভোট পাওয়ায় গ্রোসি এখনও প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আরও পাঁচ প্রার্থী

চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেতও এবারের অন্যতম আলোচিত প্রার্থী। ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী।

সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাকি সাল আফ্রিকার অন্যতম পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। উগান্ডার সাবেক জাতিসংঘ আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল ওলার ওতুনু জাতিসংঘের সংস্কার ও নৈতিক নেতৃত্বের ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁর মতে, সংস্থাটিকে আরও কার্যকর ও দক্ষ করে তুলতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। আর সর্বশেষ প্রার্থী হিসেবে প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছেন ইকুয়েডরের অভিজ্ঞ কূটনীতিক ইভন বাকী। ১৮ আগস্ট তাঁর প্রার্থিতা আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসে। ফলে তিনি প্রথম দফার জুলাইয়ের স্ট্র পোলে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি।

প্রথম নারী মহাসচিব পাওয়ার সম্ভাবনা

এবারের নির্বাচনকে ঐতিহাসিক করে তুলেছে নারী প্রার্থীদের শক্তিশালী উপস্থিতি। আট প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই নারী। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নারী মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেননি। তাই গ্রিনস্প্যান, রদ্রিগেস-বিরকেট, ব্যাশেলেত, এস্পিনোসা বা বাকীর যেকোনো একজন নির্বাচিত হলে জাতিসংঘের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় শুরু হবে। বিশেষ করে গ্রিনস্প্যান ও রদ্রিগেস-বিরকেটের প্রথম দফার শক্তিশালী অবস্থান নারী নেতৃত্বের সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।

লাতিন আমেরিকার পালা কি এবার?

এবারের প্রতিযোগিতায় লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রার্থীদের আধিপত্যও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। গ্রিনস্প্যান কোস্টারিকার, গ্রোসি আর্জেন্টিনার, ব্যাশেলেত চিলির এবং এস্পিনোসা ও বাকী ইকুয়েডরের। রদ্রিগেস-বিরকেট গায়ানার প্রার্থী। জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক কোনো বাধ্যতামূলক আঞ্চলিক রোটেশন ব্যবস্থা নেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলভিত্তিক ভারসাম্য বিবেচনার একটি রাজনৈতিক রীতি রয়েছে। ফলে এবার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের একজন প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাও কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

আসল ক্ষমতা কোথায়?

প্রথম স্ট্র পোলে কে কত ভোট পেলেন—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে। সেটি হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—এই পাঁচ দেশের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সমর্থন পেলেও পাঁচ স্থায়ী সদস্যের যেকোনো একটি দেশ তাঁকে ভেটো দিলে তাঁর প্রার্থিতা আটকে যেতে পারে। এ কারণেই প্রথম দফায় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া রেবেকা গ্রিনস্প্যানকেও এখনই নিশ্চিত বিজয়ী বলা যাচ্ছে না। বরং পরবর্তী স্ট্র পোলগুলোতে কোন প্রার্থী কতটা ‘এনকারেজ’ পাচ্ছেন এবং কোন প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘ডিসকারেজ’ বাড়ছে—সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

নতুন মহাসচিবের সামনে কঠিন বিশ্ব

২০২৭ সালের নতুন মহাসচিব এমন এক সময়ে দায়িত্ব নেবেন, যখন জাতিসংঘ নিজেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গাজা সংকট, পারমাণবিক নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, শরণার্থী সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো একাধিক সংকট একই সময়ে মোকাবিলা করতে হবে তাঁকে।

এর পাশাপাশি জাতিসংঘের আর্থিক সংকট, প্রশাসনিক ব্যয় এবং সংস্থাটিকে আরও কার্যকর করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। ইভন বাকী সম্প্রতি সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ এবং জাতিসংঘের সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন। ওলার ওতুনুও সংস্থাটির কার্যকারিতা ও নৈতিক নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

কবে জানা যাবে নতুন মহাসচিবের নাম?

নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন দফার অনানুষ্ঠানিক ভোট ও কূটনৈতিক আলোচনার পর একজন প্রার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সুপারিশ করা হবে। এরপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীকে নিয়োগ দেবে। প্রক্রিয়াটি একাধিক দফায় চলতে পারে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের মধ্যে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঐকমত্যে পৌঁছাতে দেরি হলে প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হতে পারে।

তাহলে কে সবচেয়ে এগিয়ে?

এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে কারও নাম বলা সম্ভব নয়। তবে প্রথম নিরাপত্তা পরিষদ স্ট্র পোলের ফলাফল বিবেচনায় রেবেকা গ্রিনস্প্যানই প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী। তাঁর সবচেয়ে কাছের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট। এরপর রয়েছেন রাফায়েল গ্রোসি। তবে এবারের প্রতিযোগিতার আসল লড়াই শুধু ভোটের সংখ্যায় নয়—কে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেন, শেষ পর্যন্ত তার ওপরই নির্ভর করবে ফলাফল।

আর যদি কোনো নারী প্রার্থী শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের ঐকমত্য অর্জন করতে পারেন, তাহলে জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহুপাক্ষিক সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্বে দেখা যাবে একজন নারীকে। এখন তাই সবার চোখ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দ্বিতীয় স্ট্র পোলের দিকে। সেখানেই হয়তো আরও স্পষ্ট হবে— রেবেকা গ্রিনস্প্যান কি সত্যিই পরবর্তী মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, নাকি শেষ মুহূর্তে অন্য কোনো প্রার্থী হয়ে উঠবেন ঐকমত্যের মুখ?

--

ছবিতে দেখুন

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে? আট প্রার্থীর লড়াইয়ে এগিয়ে রেবেকা গ্রিনস্প্যান, ইতিহাসের প্রথম নারী মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনা
আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন