সবার উপরে মানুষ সত্য- ধর্ম যার যার, মানবতা সবার - নন্দিনী লুইজা

আমি বরাবরই একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। আমার কাছে ধর্মের পরিচয়ের চেয়ে মানুষের পরিচয় বড়, বিশ্বাসের ভিন্নতার চেয়ে হৃদয়ের উদারতা মূল্যবান। মানুষ কোন ধর্মে বিশ্বাস করেন, কোন উপাসনালয়ে প্রার্থনা করেন, কোন আচার পালন করেন-এসবের কোনোটিই আমার কাছে তাঁর মানবিক মর্যাদা নির্ধারণের মাপকাঠি নয়। প্রত্যেক ধর্মের মানুষের প্রতি আমার শ্রদ্ধা সমান। ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, প্রার্থনার ভাষা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানুষের হাসি-কান্না, ভালোবাসা, মায়া-মমতা আর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তো একই।
এ বছর পূজামণ্ডপে গিয়েছিলাম আমরা দুজন। বাচ্চারা সঙ্গে ছিল না, তাই দুজনে মিলে প্রতিমা দর্শন, আলোকসজ্জা আর উৎসবের আনন্দ উপভোগ করছিলাম। হঠাৎ দেখা হয়ে গেল বাচ্চাদের ছোটবেলার গানের শিক্ষক জয়ন্ত স্যারের সঙ্গে। একসময় তাঁর কাছেই আমার সন্তানেরা গান শিখেছে, সুরের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। আমাদের দেখে জয়ন্ত দার আনন্দ, আন্তরিকতা, একসঙ্গে ছবি তোলা-সব মিলিয়ে মুহূর্তটি হয়ে উঠেছিল দারুণ আনন্দময়। মনে হলো, কিছু সম্পর্ক সময়ের দূরত্ব পেরিয়েও কত সুন্দরভাবে বেঁচে থাকে!
সেই মুহূর্তে আমার কাছে পূজামণ্ডপ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের স্থান ছিল না; হয়ে উঠেছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের এক আনন্দময় পরিসর। এখানে ধর্মের পরিচয় আলাদা হতে পারে, কিন্তু আন্তরিকতার ভাষা আলাদা নয়। কারও উৎসবকে সম্মান জানাতে নিজের বিশ্বাস বদলাতে হয় না; প্রয়োজন হয় শুধু অন্যের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মানসিকতা।
তবে মানুষের বর্তমান আচরণ আমাকে কখনো কখনো গভীরভাবে কষ্ট দেয়। ধর্মের নামে বিদ্বেষ, পরিচয়ের নামে বিভাজন, বিশ্বাসের নামে অন্যকে ছোট করা কিংবা ভিন্নমতকে অসম্মান করার প্রবণতা দেখে প্রশ্ন জাগে-ধর্ম কি মানুষকে আরও মানবিক করার জন্য নয়? যে বিশ্বাস মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, সংযম, ভালোবাসা ও কল্যাণবোধ জাগিয়ে তোলার কথা, সেই বিশ্বাসকে অবলম্বন করে মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি হবে কেন?
আমি বিশ্বাস করি, অসাম্প্রদায়িকতা মানে নিজের ধর্ম বা বিশ্বাসকে অস্বীকার করা নয়; বরং নিজের বিশ্বাসে অবিচল থেকেও অন্যের বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করা। অন্যের উৎসবে আনন্দিত হওয়া, অন্যের শোকের পাশে দাঁড়ানো, ভিন্ন ধর্মের মানুষের সুখ-দুঃখকে আপন করে নেওয়া-এসবই মানবিক সমাজের পরিচয়। সহনশীলতা মানে শুধু সহ্য করা নয়, পরস্পরের অস্তিত্ব ও মর্যাদাকে আন্তরিকভাবে স্বীকার করে নেওয়া।
আমার কাছে মানুষই প্রথম, মানুষই প্রধান। কোনো মানুষের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা কিংবা সহমর্মিতা প্রকাশের আগে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় জানতে চাই না। তাঁর মানবিকতা, বিবেক, আচরণ এবং অন্য মানুষের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পূজামণ্ডপে জয়ন্ত স্যারের সঙ্গে সেই আকস্মিক দেখা আবারও মনে করিয়ে দিল-মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কোনো ধর্মীয় সীমানায় আটকে থাকে না। স্মৃতি, স্নেহ, ভালোবাসা আর আন্তরিকতা সব বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে।
আজ যখন চারপাশে বিভাজনের নানা দেয়াল তৈরি হতে দেখি, তখন আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে-আমাদের পরিচয়ের শেষ কথা ধর্ম নয়, সম্প্রদায় নয়, জাতিগত বা সামাজিক বিভাজনও নয়। আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা মানুষ।
‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’- এই চিরন্তন সত্য শুধু কবিতার পঙ্ক্তি হয়ে থাকুক, তা চাই না; এটি হোক আমাদের চিন্তায়, আচরণে, সামাজিক মূল্যবোধে এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিফলিত হওয়া এক মানবিক অঙ্গীকার।
ধর্ম থাকুক মানুষের আত্মিক আশ্রয় হয়ে, উৎসব হয়ে উঠুক সম্প্রীতির সেতু, আর মানবতা হোক আমাদের সকল সম্পর্কের ভিত্তি। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে বড় করে তার পরিচয় নয়, তার মনুষ্যত্ব।
সবার উপরে মানুষ সত্য-এই বিশ্বাসেই আমার পথচলা, এই বিশ্বাসেই আমার স্বপ্ন, এই বিশ্বাসেই আমার মানবিক পৃথিবীর প্রত্যাশা।
এ বছরের পূজায় তাই আমাদের দুজনের ঘোরাঘুরির ঝুলিতে জমা হলো এক সুন্দর আকস্মিক দেখা, কিছু আনন্দমাখা ছবি আর বাচ্চাদের শৈশব ছুঁয়ে যাওয়া এক টুকরো ভালো লাগা। ❤️
লেখক,কলামিস্ট,প্রকাশক ও সমাজ কর্মী
