"ভাঙা-ছাঁচ" - নিশাত তামান্না কনক

বিয়ের আগের রাতে মরিয়মের মা একখানা কাঁসার থালা মাজতে মাজতে বললেন, "এইটা সাধের থালা। পয়লা পোয়াতিতে সাত মাসের মাথায় আমি নিজে আইস্যা এইটায় একুশ পদ সাজায়া তোরে খাওয়ামু।"
মরিয়মের বয়স তখন সতেরো। জহুর নৌকার মিস্ত্রি, কাঠ চাঁছতে চাঁছতে হাতে কড়া পড়েছে। কথা কম বলে।
বিয়ের এক বছর পর মরিয়ম পোয়াতি হলো। নিজে টের পেল দুই মাসের মাথায়। সেই বছর ভাদ্র-আশ্বিনে মাসের শেষ দিকে তার পাতে থাকত ভাত আর লবণ-মরিচ। জহুর কিছু বলত না, মরিয়মও কিছু চাইত না।
সাত মাসে মরিয়মের মা এলেন। কাঁসার থালায় ইলিশের পাতুরি, কইমাছ, পায়েস, দই, ছয় রকম ভর্তা, একুশ পদ। পাড়ার মহিলারা ঘিরে বসল। বলল, "বউটা লক্ষ্মী।"
সাত মাসে একুশ পদ। প্রথম মাসে একখান শাকও না।
নয় মাসে ছেলে হলো। জোরে কাঁদল। কিন্তু দাই কাপড় সরিয়ে চুপ হয়ে গেলেন। পিঠের শেষ মাথায়, কোমরের একটু ওপরে, ডিমের মতো একটা থলি। পাতলা চামড়ায় ঢাকা, ভেতরে পানি টলটল করছে।
দাই বললেন, "জিনের থাবা। কাউরে কইস না, নজর লাগব।"
শাশুড়ি বললেন, "ছাওয়াল ল্যাংড়া হইব।"
জেলার হাসপাতালে অপারেশন করে থলিটা বন্ধ করা হলো। মাথার পানি বের করার নল বসানো হলো। কিন্তু পা দুটো আর নড়ল না। ছেলের নাম রাখা হলো সোহেল।
জহুর রাতের পর রাত জেগে ছোট্ট একখানা কাঠের গাড়ি বানাল। চারটে চাকা, ওপরে বসে দুই হাতে মাটি ঠেলে চলা যায়। চাকায় লাল রং দিল। বলল, "আমার ছাওয়াল হাঁটব না, তয় দৌড়াইব।"
দুই বছর পর মরিয়ম আবার পোয়াতি হলো। এবার ভয়ে কাউকে বলেনি। যতদিন পেরেছে লুকিয়ে রেখেছে। আট মাসে প্রসব হলো। মেয়ে। মাথার খুলির ওপরটা পুরো হয়নি। বাচ্চাটা কয়েক ঘণ্টা শ্বাস নিল। মরিয়ম তাকে কোলে নিয়ে বসে রইল। ভোররাতে জানালায় শুকতারা উঠেছিল। মরিয়ম মনে মনে নাম রাখল তারা।
শাশুড়ি বললেন, "মরা বাচ্চার নাম রাখতে হয় না।"
পাড়ার মহিলারা বলল, "অর্ধেক বানাইয়া ছাইড়া দেয়। এর শরীরের ছাঁচটাই ভাঙা।" নতুন একটা নাম চালু হলো: ভাঙা-ছাঁচের বউ।
মরিয়ম কোনোদিন উত্তর দেয়নি। সে নিজেও বিশ্বাস করে ফেলেছিল, তার শরীরের ছাঁচে কোনো দোষ আছে। তারপর আর কাউকে বলেনি যে সে পোয়াতি। আর পোয়াতি হয়ওনি।
সোহেলকে মরিয়ম কোলে করে তিন মাইল হেঁটে স্কুলে নিয়ে যেত। দিনে তিনবার ছেলের প্রস্রাবের নল বদলাত, একা, ঘরের পেছনে। সোহেল ক্লাসে প্রথম হতো। ছেলেরা তার গাড়ির নাম দিয়েছিল ল্যাংড়া-গাড়ি। সোহেল হাসত। কিন্তু মরিয়মের বুকের ভেতর সেই হাসি সইত না।
২০২৬ সালে জহুরের ভাইয়ের ছেলে আসিফের বিয়ে হলো। বউ রুবি, দশম শ্রেণি পাস। বিয়ের তিন মাস পর রুবি বলল, "চাচি, বাচ্চা নিতে চাই। কমিউনিটি ক্লিনিকে একবার যামু, আপনে সাথে যাইবেন?"
মরিয়ম সোহেলের ওষুধ আনার নাম করে সঙ্গে গেল।
ক্লিনিকে স্বাস্থ্যকর্মী আপা রুবিকে বললেন, "বাচ্চা নেওয়ার আগে থিকা ফলিক এসিড খাইতে হয়। গর্ভের পয়লা মাসেই বাচ্চার মেরুদণ্ড আর মাথার নল জোড়া লাগে। তখন অনেক মায়ে জানেই না যে প্যাটে বাচ্চা আসছে।"
মরিয়ম বেঞ্চে বসে ছিল দেয়ালের ধারে। ধীরে ধীরে উঠে সামনে এসে জিজ্ঞেস করল, "আপা, ওই নল না জোড়া লাগলে কী হয়?"
আপা একটু অবাক হয়ে তাকালেন। বললেন, "খালা, কারো পিঠে থলি হয়, পা নড়ে না। কারো মাথার খুলি পুরা হয় না।"
মরিয়ম আর একটা প্রশ্নই করল, আস্তে করে। "এই ওষুধ কতদিন হয় আসছে আপা?"
"আপনের বিয়ার আগে থিকা, খালা।"
"দাম কত?"
আপা হাসলেন। "দিনে এক টাকাও লাগে না।"
মরিয়ম বেঞ্চে ফিরে বসল। অনেকক্ষণ উঠল না। মনে মনে হিসাব করছিল, সাধের একুশ পদে মা কত খরচ করেছিলেন। হিসাব মিলল না। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার হলো। যা লেগেছিল, তার দাম সাধের একটা পদের দামও না।
বাড়ি ফিরে মরিয়ম ঘরের কোণার ট্রাঙ্ক খুলল। কাপড়ে মোড়ানো কাঁসার থালাটা বের করল। পনেরো বছর খোলেনি। মেজে চকচকে করল। তারপর তাতে রাখল এক পাতা ফলিক এসিড, একমুঠো লালশাক, দুটো ডিম, এক বাটি মসুর ডাল।
রুবিকে ডেকে বলল, "নে, এইটা সাধের থালা না। এইটা আগের থালা। সাধের আগের কথা এইটাতে থাকব।"
শাশুড়ি, তখন অনেক বুড়ো, দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "এই রীতি কোন কিতাবে আছে?"
মরিয়ম বলল, "আমার কিতাবে, আম্মা।"
শাশুড়ি আর কিছু বললেন না।
এক বছর পর এক ভোররাতে রুবির মেয়ে হলো। সুস্থ, গোলগাল, জোরে কাঁদছে। সোহেল সারা রাত বারান্দায় নিজের গাড়িতে বসে জেগে ছিল। ভোরে আকাশে শুকতারা উঠল।
রুবি মেয়েকে সোহেলের কোলে দিয়ে বলল, "ভাইয়া, তুমি ওর নাম রাখো।"
সোহেল অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। বলল, "তারা।"
রান্নাঘরের দরজায় মরিয়মের হাত থেকে হাতাটা পড়ে গেল।
সেই রাতে সবাই ঘুমালে মরিয়ম সোহেলের গাড়ির পাশে গিয়ে বসল। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, "তোর একটা বইন আছিল বাপ। ওর নাম আমি রাখসিলাম তারা। কাউরে কই নাই।"
সোহেল আস্তে আস্তে মায়ের হাত টেনে নিজের গালে ঠেকাল। বলল, "আম্মা, আমি জানতাম। তুমি ঘুমের মধ্যে ডাকতা।"
এক চিকিৎসকের ডায়েরি থেকে:
হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে দাঁড়িয়ে আজও যখন মরিয়মদের মতো কোনো মায়ের কোলে পিঠে থলি হওয়া বা খুলিহীন নিথর সন্তান তুলে দিতে হয়, তখন আমার জহুরের সেই লাল চাকার কাঠের গাড়িটার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে ভোররাতের শুকতারাটার কথা।
আমাদের দেশের মায়েরা আজও বিশ্বাস করে তাদের শরীরের ছাঁচটাই বুঝি ভাঙা। অথচ তারা জানে না, এই ভাঙা ছাঁচ কোনো নিয়তি ছিল না—ছিল অসচেতনতার খেসারত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম নিউরাল টিউব ডিফেক্ট।
খুব সহজ করে যদি বলি—পানপাতা গুটিয়ে যেমন খিলি বানাতে হয়, গর্ভের ভেতরে সন্তানের মস্তিষ্ক আর মেরুদণ্ডও শুরুতে ঠিক তেমনি একটি চ্যাপ্টা পাতার মতো থাকে। গর্ভধারণের প্রথম চার সপ্তাহের ভেতর সেই পাতাটি দুই পাশ থেকে গুটিয়ে সুন্দর একটি নলে পরিণত হয়। খিলি বানাতে যেমন চুন লাগে, এই মেরুদণ্ডের নলটি নিখুঁতভাবে জোড়া লাগাতে শরীরের প্রয়োজন হয় এক ফোঁটা ‘ফলিক এসিড’।
সেই উপাদানের ঘাটতি হলে খিলির মুখ আধখোলা থেকে যায়। নলের নিচের মুখ জোড়া না লাগলে পিঠে তরলভর্তি থলি নিয়ে জন্ম নেয় শিশু—যাকে আমরা বলি স্পাইনা বিফিডা। এদের পা দুটো আর কোনোদিন মাটিতে দাঁড়ায় না, প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ থাকে না, মাথার ভেতর জমতে থাকে পানি। আর নলের ওপরের মুখ বন্ধ না হলে মাথার খুলিটাই তৈরি হয় না—যার নাম অ্যানেনসেফালি। এমন সন্তান পৃথিবীর আলোয় কয়েক ঘণ্টার বেশি বাঁচে না।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই পুরো অঙ্গ তৈরির প্রক্রিয়াটি শেষ হয়ে যায় গর্ভধারণের প্রথম মাসের ভেতরেই। অর্থাৎ, একজন নারী যখন নিজের গর্ভধারণের খবরটি নিশ্চিতভাবে জানতে পারেন, ততক্ষণে গর্ভের মেরুদণ্ড জোড়া লাগার কাজ প্রায় শেষ!
আমরা বাঙালিরা মেয়েদের সাত মাসের মাথায় সাধের থালায় একুশ পদ রেঁধে দিই, পাড়া-প্রতিবেশী ডেকে উদযাপন করি। কিন্তু যে সময়ে শরীরের সবচেয়ে বেশি পুষ্টি প্রয়োজন ছিল—গর্ভধারণের সেই শুরুর দিনগুলোতে—তখন হয়তো তার পাতে জোটে স্রেফ লবণ আর মরিচ।
তাই বিজ্ঞানের শিক্ষা খুব স্পষ্ট: সাধের থালা সাজানোর আগেই সাজাতে হয় ‘আগের থালা’। সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করার অন্তত এক থেকে তিন মাস আগে থেকেই প্রতিদিন একটি করে ফলিক এসিড ট্যাবলেট শুরু করা জরুরি, এবং তা চালিয়ে যেতে হয় গর্ভের প্রথম তিন মাস পর্যন্ত।
সবুজ শাকসবজি, ডাল, ডিম বা কলিজায় ফলিক এসিড থাকে ঠিকই, কিন্তু গর্ভের সেই সূক্ষ্ম নল নিখুঁতভাবে জোড়া লাগানোর জন্য শুধু খাবারের জোগান পর্যাপ্ত না-ও হতে পারে। দিনে এক টাকারও কম দামের এই ছোট্ট ট্যাবলেটটিই পারে একটি শিশুর আজীবন পঙ্গুত্ব ঠেকিয়ে দিতে।
যাঁদের আগে এমন সন্তান জন্মের ইতিহাস রয়েছে, কিংবা যাঁদের ডায়াবেটিস বা মৃগীরোগ আছে, তাঁদের জন্য এই ওষুধের মাত্রা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি (প্রায় দশ-বারো গুণ) প্রয়োজন হয়। তাই গর্ভে সন্তান আসার আগেই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটা জীবন বাঁচানোর পূর্বশর্ত।
তবে একটা বুকভাঙা সত্যও মনে রাখা দরকার—ফলিক এসিড এই ঝুঁকিকে প্রায় আশির ভাগ কমিয়ে দেয়, কিন্তু হয়তো পুরোপুরি শূন্য করতে পারে না। তাই কোনো মায়ের কোলে যদি আজও এমন সন্তান আসে, তবে সমাজের কোনো অধিকার নেই তাঁকে ‘ভাঙা-ছাঁচ’ বলে অপবাদ দেওয়ার। দোষ তাঁর নয়; ত্রুটি ছিল আমাদের, আমরা সময়মতো তাঁদের এই সামান্য সত্যটুকু জানাতে পারিনি।
আজ যদি আপনার পরিবারের বা চেনা-পরিচিত কোনো নারী সন্তান নেওয়ার কথা ভেবে থাকেন, তবে সাত মাসের সাধের দিনটির জন্য বসে থাকবেন না। কাঁসার থালা সাজানোর আগেই তাঁর হাতে তুলে দিন এক পাতা ফলিক এসিড।
সব মরিয়মের ঘরে যেন একটি করে সুস্থ, ফুটফুটে ‘তারা’ হেসে ওঠে।
ডা. নিশাত তামান্না
গাইনি ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ
