প্রবাসে দেশীয় সংস্কৃতির সুরঝংকার: নিউ ইয়র্কে ‘দ্য বিউটিফুল লেডিস অব ইউএসএ’র মুগ্ধতার এক সন্ধ্যা

আকবর হায়দার কিরন
কাজের ব্যস্ততা, সংসার আর নাগরিক জীবনের চেনা ছন্দের বাইরে প্রবাসে নিজেদের জন্য একটু আনন্দময় সময় খুঁজে পাওয়া সহজ কথা নয়। বিশেষ করে নিউইয়র্কের মতো তীব্র ব্যস্ত নগরীতে সেই সুযোগ আরও সীমিত। তবে সব ব্যস্ততাকে একপাশে সরিয়ে রেখে নিউ ইয়র্কের প্রবাসী বাঙালিদের সুর, নৃত্য আর আড্ডার এক অপূর্ব বন্ধনে বাঁধলো ‘দ্য বিউটিফুল লেডিস অব ইউএসএ’ (The Beautiful Ladies of USA)। গত ২ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যায় লং আইল্যান্ড সিটির ইভানজেল ক্রিশ্চিয়ান সেন্টারে (Evangel Christian Center) আয়োজিত হলো ব্যতিক্রমী ও আড়ম্বরপূর্ণ মিউজিক্যাল কনসার্ট “অ্যান আনফরগেটেবল মিউজিক্যাল নাইট” (An Unforgettable Musical Night)।
‘দেশী মিউজিক অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট’ (Deshi Music & Entertainment)-এর জামান মনিরের সহযোগিতায় আয়োজিত এই উৎসবমুখর সন্ধ্যায় বাংলাদেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ইমরান মাহমুদুল, দিলশাদ নাহার কণা এবং ঝিলিক-এর প্রাণবন্ত পরিবেশনায় মুগ্ধ হন কানায় কানায় পূর্ণ অডিটোরিয়ামের দর্শক-শ্রোতারা। আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা সিলভি আকন্দ ও নাদিয়া চৌধুরীর স্বাগত বক্তব্যের পর শারমীন সিরাজ সোনিয়া-র প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। বিশেষ সহযোগিতায় ছিলেন আজিজুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানের সুরের খাতা খোলেন কণ্ঠশিল্পী ঝিলিক। তিনি কালজয়ী রবীন্দ্রসংগীত “পুরানো সেই দিনের কথা” দিয়ে তাঁর পরিবেশনা শুরু করেন। পরবর্তীতে সাবিনা ইয়াসমিন ও রুনা লায়লার জনপ্রিয় বেশ কিছু গানসহ ক্লাসিক ও ফোক গানের মেলোডি পরিবেশন করেন তিনি। এর পরপরই মঞ্চে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে রাসেল আহমেদের পরিচালনায় ‘ফিউশন ডান্স ট্রুপ ইউএসএ’ (Fusion Dance Troupe USA)-এর চোখধাঁধানো পরিবেশনা। চমৎকার কোরিওগ্রাফি ও দলীয় সমন্বয়ে নৃত্যশিল্পীরা পুরো অডিটোরিয়ামে অন্যরকম এক আমেজ তৈরি করেন।
পরের পর্বে মঞ্চে আসেন বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও দুর্দান্ত স্টেজ পারফরমার ইমরান। দরাজ কণ্ঠ ও দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের মাধ্যমে পুরো অডিটোরিয়ামকে নিজের ছন্দে মেতে তোলেন তিনি। ইমরান পরিবেশন করেন তাঁর জনপ্রিয় গান— “তুই কি আমার হবি রে”, “এ জীবনে যারে চেয়েছি”, “বলতে চেয়ে মনে হয়”, “কন্যা কন্যা কন্যারে”, “আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো তুমি ছাড়া”, “কিশোরী”, “ওহে শ্যাম তোমারে আমি নয়নে রাখিবো”, “তোকে ছাড়া বাঁচা মুশকিল”, “তুমি আমার জীবন” এবং কালজয়ী ফোক “আমার সোনা বন্ধু রে”।
সবশেষে মঞ্চ মাতাতে আসেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কণা। নিজের মিষ্টি কণ্ঠে “ধিন তা না” দিয়ে পারফর্ম্যান্স শুরু করে তিনি একে একে গেয়ে শোনান “বৈশাখী বিকেল বেলা”, “রেশমি চুড়ি”, “কন্যা রে” এবং কালজয়ী গান “যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়”। মধ্যরাতের স্তব্ধতায় কণার কণ্ঠে “যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়” গানটির মায়াবী সুর উপস্থিত প্রতিটি প্রবাসীর মনে এক গভীর নস্টালজিয়া ও তৃপ্তির রেশ রেখে যায়।
এই আয়োজনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি ছিল মঞ্চের পেছনের মূল ভাবনা ও ‘দ্য বিউটিফুল লেডিস অব ইউএসএ’-এর পথচলা। মূলত নিউ ইয়র্কে বসবাসরত বিভিন্ন পেশার নারীদের একটি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। যেখানে নারীরা তাঁদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও ভাবনা ভাগ করে নিতেন। ধীরে ধীরে সেই অনলাইন যোগাযোগ বাস্তবে এক শক্ত নেটওয়ার্কে রূপ নেয়।
পরবর্তীতে নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বিভিন্ন মেলা ও ঈদ ফেয়ার আয়োজনের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মটি অনন্য ভূমিকা রাখা শুরু করে। সিলভি আকন্দ ও নাদিয়া চৌধুরীর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও পরিশ্রমে এটি এখন নিউইয়র্কের ব্যস্ত জীবনে নারীদের একত্রিত করা এবং বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করার এক শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। অনুষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জাহিদ আলম। সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন শাহ নেওয়াজ, রায়হান জামান এবং বিশিষ্ট অ্যাটর্নি মইন চৌধুরী।
এছাড়াও পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত ছিল ফ্রেমওয়ার্ক ফাইন্যান্স এলএলসি বাই উৎসব গ্রুপ (Framework Finance LLC by Utshob Group), সোশ্যাল কেয়ার নেটওয়ার্ক (Social Care Network), ট্রিপল এ সুপ্রিম প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট (AAA Supreme Property Management), এনওয়াইএসডিসি (NYSDC) এবং স্টার ফার্নিচার্স । একঘেয়ে কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝে প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য, চমৎকার গান আর এক সুতোয় বাঁধা পড়ার এই রাতটি নিউ ইয়র্কের বাঙালিদের স্মৃতির অ্যালবামে দীর্ঘকাল এক মধুর অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
ছবিতে দেখুন






