ইসরায়েলে দীর্ঘ যুদ্ধের প্রভাবে রাজনীতি ও সেনাবাহিনীর বিরোধ কেন প্রকাশ্যে আসছে

খেলা ৬ আগস্ট ২০২৬ ৪৭০০

গাজা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমঝোতা ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধের লক্ষ্য ও নীতি নির্ধারণ নিয়ে সরকারের সঙ্গে সেনাপ্রধানের দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে রূপ নিচ্ছে।

ইসরায়েলে দীর্ঘ যুদ্ধের প্রভাবে রাজনীতি ও সেনাবাহিনীর বিরোধ কেন প্রকাশ্যে আসছে

ইসরায়েল সৃষ্টির পর থেকে রাজনৈতিক প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে গোপনীয়তা রক্ষার একটি ঐতিহ্য ছিল। রণকৌশল কিংবা যুদ্ধ পরিচালনায় মতপার্থক্য থাকলেও তা আড়ালেই মীমাংসা হতো। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর অব্যাহত সংঘাত সেই পুরোনো ধারাকে বদলে দিয়েছে। এখন সরকার পরিচালনা পর্ষদ ও সামরিক কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ফাটল ধরায় তা জনসমক্ষে চলে আসছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে দায়িত্বরত কমান্ডিং অফিসার মেজর জেনারেল আভি ব্লুথের মধ্যকার সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই টানাপোড়েনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এক চরমপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীর আটকের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে ব্লুথের সিদ্ধান্তের চরম বিরোধিতা করেন কাটজ। এমনকি সম্প্রচারমাধ্যমে সরাসরি উপস্থিত হয়ে ওই সেনাকর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের নির্দেশ দেন মন্ত্রী। কিন্তু দেশটির সেনাপ্রধান আইয়াল জামির ওই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ব্লুথ নিজ পদেই বহাল থাকবেন এবং সামরিক বিধিমালা অমান্য করে এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই সংঘাত কেবল দুজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বহাল থাকা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ কীভাবে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে, তারই লক্ষণ। এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে সামরিক কৌশল নির্ধারণে কার প্রাধান্য থাকবে, বিজয়ের মাপকাঠি কী এবং বাস্তবে তা অর্জনের ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে কি না।

ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী কেবল রাজনৈতিক নির্দেশ বাস্তবায়নের হাতিয়ার ছিল না। ডেভিড বেন-গুরিয়ানের হাত ধরে তৈরি সামরিক কাঠামোটি নীতি নির্ধারণেরও অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ইৎজহাক রবিন, এহুদ বারাক, এরিয়েল শ্যারন, বেনি গান্টজ কিংবা ইয়োভ গ্যালান্টের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সামরিক পটভূমি থেকেই উঠে আসেন। দীর্ঘদিন অলিখিত নীতি ছিল যে, বাহিনীর প্রধানেরা রাজনীতির উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমা নির্ধারণ করে দিতেন এবং নীতিপ্রণেতাদের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাতেন।

তবে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পারস্পরিক সম্পর্কে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে গেছে। দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে রিজার্ভ সেনাসদস্যদের তলব, নতুন এলাকার অভিযান এবং জিম্মিদের মুক্তির চেষ্টার মতো সিদ্ধান্তগুলো সরাসরি সাধারণ জনগণের জীবনকে প্রভাবিত করছে। তাছাড়া, সরকারের কাছে হামাস ধ্বংস মূল অগ্রাধিকার হলেও কারও কাছে বন্দিদের উদ্ধার বা স্থায়ী দখলের ঝুঁকি বিবেচনা করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সেনাকর্মকর্তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, অন্যদিকে মন্ত্রীরা ভোট ও ক্ষমতার সমীকরণে চালিত হচ্ছেন।

বর্তমানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেনাবাহিনীকে কোনো লক্ষ্য অর্জনের বাধ্যবাধকতা দিয়ে দিচ্ছে এবং ব্যর্থতার সব দায় সামরিক বাহিনীর ওপর চাপাচ্ছে। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী, নিরাপত্তাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের মধ্যে কার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে—সে বিষয়ে গভীর ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যে এই ক্ষমতার রেষারেষি শেষ পর্যন্ত গাজা যুদ্ধের পরিণতি ও মানবিক মূল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন দিন