নন্দিনী লুইজা 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ছবির হাট – সন্ধ্যা নামছে।রাস্তার পাশে আলো ঝিমিয়ে পড়েছে। হকাররা গুটিয়ে নিচ্ছে তাদের ছবি, পোস্টার, ব্রাশ।ছবির হাটের কোণে এক তরুণ পড়ে আছে,মুখে ফ্যাকাসে ছায়া, দেখে মনে হচ্ছে মারা গিয়েছে। চারপাশের মানুষ তাকাচ্ছে, কেউ কেউ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।কোনো বিপদ যেন ঘাড়ে না আসে। 

কবি আজ ছুটির দিন ভেবে আড্ডা দিতে নিজের এলাকা ছেড়ে সোহরাওয়ার্দির উদ্যানে, টিএসসির মোড়ে একটু বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে চেয়েছিল সেই উদ্দেশ্যে ছবির হাটের ভিতর দিয়ে পথ চলা। এখানে প্রায় দিন কবিদের, শিল্পীদের, আড্ডা হয়। তাই কবি ভিতরে ঢুকে অন্যান্য বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করছে, ইতিমধ্যে সে দেখতে পায় একটা তরুণ মাটির মধ্যে লুটিয়ে পড়ে আছে হয়তো মারা গেছে। আশেপাশের লোকজন ছিল তারাও কেন জানি এমন দৃশ্য দেখে আস্তে আস্তে সরে পড়তে থাকলো্ কোন বিপদে না পড়ে, পুলিশের ঝামেলা যদি করতে হয় অথবা সাক্ষীর প্রয়োজন হয় কিন্তু কবি আর সবার মতো হতে পারলো না। 

কবি রাস্তায় এসে অনেককে ডাকলো। ভ্যানওয়ালা, রিক্সাওয়ালা পথিক যাকে সামনে দেখছে তাকেই ভাই আমার সঙ্গে একটু আসো আমি একটু বিপদে পড়েছি আমাকে একটু সাহায্য কর। মাঠের মধ্যে একটু আসতে হবে। একজন যুবক রিক্সাওয়ালা সে রাজি হলো কিন্তু বললো আমার খালি রিক্সা রাস্তায় রেখে যেতে পারবো না। ভ্যানওয়ালা বলল আমার পক্ষে সম্ভব না এ ধরনের নানা কথা। শেষে একজন রাজি হয়ে গেল, সেই রিকশাওয়ালাও এই অবস্থা দেখে বলল- এই যে ভাইটা মরে গেছে মনে হয়। পুলিশে ঝামেলা হবে, চলেন, চলে যাই।

সবাই সরে যায়। ফুটপাত খালি। হঠাৎ কবি ফোন দিয়ে বন্ধুদের  আসতে বলল।ঘন্টা খানিকের মধ্যে দুই চার জন বন্ধু এসে হাজির। কবি বিশ্বের আছে এটা কি বলল দেখ তো তার জীবন আছে নাকি? রিক্সাওয়ালা ছেলেটা নিচু হয়ে দেখলো তরুণের বুক হালকা ওঠানামা করছে। রিক্সাওয়ালা ছেলেটার নাম রফিক চিৎকার দিয়ে বলে- না, এখনো বেঁচে আছে!

কবি তার বন্ধুদের সহযোগিতায় অচেতন পড়ে থাকা ছেলেটা কে ধরে  পাচিলের এপারে এনে রাস্তায় রেখে দেওয়া রিক্সায় তুলে রফিককে বলে চল-তাড়াতাড়ি চল- ঢাকা মেডিকেলে। রফিকের রিকশায় ছেলেটা, সাথে বাঁধন, কবির একজন জুনিয়র বন্ধু বসে অন্য বন্ধুসহ কবি অন্য রিক্সায়।উদ্দেশ্য ছেলেটাকে বাঁচানো যায় কি না।  ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে রাত অনেক গেল। যখন ঢামেকে পৌঁছানো হয় তখন রাত দশটা বাজে। 

ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড। নিয়ন আলো, দৌড়ঝাঁপ, নার্সদের ডাকাডাকি। কবি তরুণটিকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে ডাক্তারদের ডাকলেন এবং ব্যবস্থা নিতে বললেন। প্রাথমিক অবস্থায় ডাক্তার দেখে বললেন উনি হয়তো আর দুই এক ঘণ্টা বাঁচবে। তার বিষক্রিয়া হয়েছে, উনাকে যদি আমরা এখন ওয়াশ করতে যাই হয়তো একটা অঘটন ঘটে যাবে কিন্তু কবি কেন যেন বারবার বলছিল একটু চেষ্টা করুন না, দেখুন না সে আসলে কি খেয়েছে বা তার কি অবস্থা। পরবর্তীতে জানা গেল সে কীটনাশক খাইনি, ঘুমের ওষুধ খাইনি সে খেয়েছে এক বোতল ডেটল। কবির অনুরোধে ডাক্তাররাও স্বাক্ষর লিখে নিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করল। যতই ওয়াশ করছে ততই ফেনা বের হচ্ছে। যতই ওয়াশ করছে ততই ফেনা বের হচ্ছে। এভাবে সারা রাত ধরে পাকস্থলী পরিষ্কার করার কাজ চলছিল

ভোরের দিকে আস্তে আস্তে তরুণটি একটু নড়েচড়ে ওঠে। ডাক্তার মাথা নাড়লেন। সারা রাত লেগে গেল চিকিৎসায়। কবি করিডোরে বসে। চোখে ক্লান্তি, হাতে একটা পুরনো কবিতার বই।রাত তিনটা। এক নার্স এসে বলল-“স্যার, ছেলেটা স্টেবল।” কবি নিঃশব্দে তাকালেন-হঠাৎ মনে হলো নিজের যুবক বয়সের মতোই একটা মুখ।

পরদিন সকাল। তরুণ ধীরে চোখ খুলছে। ডাক্তার বললেন, “আপনি ভাগ্যবান, আর যদি আধাঘণ্টা দেরি করত...”: “আমাকে কে এনেছে? 

কবি (হাসলেন): “একজন কবি, যে তোমার মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি।” তরুণ (চোখ মেলে): “আপনি কবি?”

কবি :“কখনো ছিলাম। এখন শুধু মানুষ বাঁচানোর চেষ্টা করি।”

তখনো জানা হয়নি ছেলেটার বাড়ি কোথায়? কি করে? তার পরিবারে আছেই বা কে? কবি মানবিক এবং আবেগী দেখেই পথের একজন তরুণকে ঠিকানা বিহীন অবস্থায় বাঁচার জন্য আকুতি। 

তরুণের চোখে জল। নাম জানাল রকিব, বয়স ২৫,বাড়ি নরসিংদী। বাড়িতে দুই ভাই বোন আর বাবা, মা বসবাস করে। 

্য“আমি-ও কবিতা লিখতাম... কেউ পড়ত না, বুঝত না... স্ত্রীও চলে গেল।”

কবি: “বিয়ে?”

রকিব: “মাত্র তিন মাস হলো। ও খুব আধুনিক, স্বাধীনচেতা... বলতো, আমি নাকি ‘দুঃখের কারিগর’। ও বলেছিল—প্রেম করা যায়, সংসার করা কঠিন”। কবি নীরব থাকলেন। বাইরে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ছে।

 ইতোমধ্যে হাসপাতালের স্বাভাবিক কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। রকিবের কাছ থেকে বন্ধুদের নম্বর নিয়ে ফোন করা হয়েছে। ঘন্টা দুই পর রকিবের বন্ধু কয়েকজন এসে পড়ল। কবি নিজের বন্ধুদের ফোন করে টাকাপয়সা জোগাড় করলো। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে সপ্তাহখানেক থাকতে হবে। সে ব্যবস্থা বন্ধু-বান্ধব সবাই মিলে করেছে। এরপর সিদ্ধান্ত হলো রকিব কে নরসিংদী পাঠাতে হবে। পরিবারের লোকজন হয়তো তাকে কতইনা খোঁজাখুঁজি করছে। 

কবি:“ছেলেটাকে নরসিংদীতে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে। ও এখনোও ভাঙা।”

সবাই মিলে রকিবকে বাসে তুলে দিলো। যাওয়ার আগে রকিব বলল-

“আপনি না থাকলে আজ আমি থাকতাম না।”

কবি: “থাকো, কিন্তু এবার বাঁচো কবিতায়।”

বাস ধীরে ধীরে রওনা দিল। বাসের জানলায় মুখ বের করে রকিব সবাইকে বিদায় জানালো। 

কয়েক বছর পর- রকিব এখন ঢাকায়।

এক সাহিত্য উৎসবের পোস্টার: “কবি রকিব রহমান - নতুন প্রজন্মের কণ্ঠ।”

বড় হলরুমে আলো, দর্শকের ভিড়।স্টেজে রকিব মাইক্রোফোনে দাঁড়িয়ে বলছে-

“আমার জীবনে একজন মানুষ ছিলেন, যাকে আমি বাবা বলি, কিন্তু তিনি আমার রক্তের নন।

তিনি আমার কবিতার উৎস-ঢাকা শহরের এক কবি।”সভায় সবাই নীরব। আলো পড়ছে তার মুখে।

সে পড়ছে নতুন কবিতা-

“একজন অচেনা মানুষ আমাকে মৃত্যু থেকে টেনে এনেছিল,

আমি তাকে বলি- আমার বাবা।

তিনি আমার শরীর বাঁচাননি, আত্মাকেও বাঁচিয়েছেন।”

তালি। ফ্ল্যাশলাইট।

কবি পিছনের সারিতে বসে আছে- চোখ ভিজে গেছে।

রাতে কবি-এর বাসায় ফিরলো। অনুষ্ঠানের ফ্লেভার এখনও হৃদয় মনে। রকিব কে বাসায় আসতে বলে। মাস তিনেক পর একদিন রকিবের ফোন কবি বাবা আমি আপনার বাসায় আসছি বাসায় আছেন। শুক্রবার ছুটির দিন কবি বাসাতেই তাই রকিব কে আমন্ত্রণ জানালো। 

 কবির বাসায় ঘর ভর্তি বই, জানালার পাশে পুরনো টাইপরাইটার।

রকিব এসে বসেছে সামনে।

রকিব: “বাবা, আমি একটা জিনিস শিখেছি-প্রেম, ব্যর্থতা, মৃত্যু- সবই কবিতার পথ।”

কবি: “এবং কবিতা জীবনেরও পথ।”

দুজনেই নীরব।

রকিব ধীরে বলল-

“আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে গেছে, কিন্তু আমি তার জন্য ঘৃণা রাখিনি। কারণ ও না গেলে আমি আপনাকে পেতাম না।”

কবি মৃদু হাসলেন-

“তুমি বুঝে ফেলেছ, হারানো মানুষই মাঝে মাঝে নতুন মানুষকে উপহার দেয়।”

 বছর দুই পরে রকিব এখন বাংলাদেশের একজন নামকরা কবি তারপরেও সে মনে করে বাবা গভীর জন্যই আজ পুনর্জন্ম। রকিব জানতে পারে তার বাবা কবি খুবই অসুস্থ তাই হাসপাতালে ছুটে যায়-

রকিব: “বাবা, আমি ভয় পাচ্ছি।”: “ভয় পেয়ো না। তুমি তো কবি। মৃত্যু কবিতার শেষ লাইন নয়, নতুন ক্যানভাস।”

বালিশের নিচে তিনি একটি খাম দিলেন-

“তোমার পরের বইয়ের নাম দিও ‘কবি বাবা’। এতে আমার বেঁচে থাকা থাকবে।”

সেই রাতেই কবির স্বাভাবিক জীবনের প্রস্থান। রকিব দুঃখ কে জয় করেছে নানান সময় কবি বাবা তাকে তৈরি করেছে তাই কবির অবর্তমানে রকিব সেই জায়গায় যেতে চায় কবির অসমাপ্ত কাজ করে যেতে চায়। 

একুশের বইমেলা, পরের বছর।

বুকস্টলে নতুন বই “কবি বাবা”—লেখক: রকিব রহমান।

প্রচ্ছদে ছবি-ঢাকার আকাশে এক নিঃসঙ্গ কবির ছায়া।

রাকিব স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বলছে-“মানুষের বাবা একজন, কিন্তু আমার দুইজন।

একজন জন্ম দিয়েছেন, আরেকজন জীবন দিয়েছেন।”

আকাশে মৃদু হাওয়া বয়ে যায়।কোথাও যেন ভেসে আসে কণ্ঠ-“কবিতা মানুষকে বাঁচায়, যদি কেউ মন দিয়ে শোনে।”

ঢাকা শহরের রাত, নরম আলো, দূরে আজও বাজে কবিতার ছন্দ। রাতে নিয়নের আলো আর মায়াবী পরিবেশ রিম ঝিম বৃষ্টি শরতের স্নিগ্ধ আকাশ সব যেন কবি আর কবিতার জন্যই সৃষ্টি।