এম আব্দুর রাজ্জাক, বগুড়া থেকে :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়ায় সাতটি সংসদীয় আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জয় হয়েছে। জেলার সাতটি আসনেই দলটির প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছে। (১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ) মধ্যরাতে ভোট গণনা শেষে বগুড়া জেলা রিটানিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান এসব তথ্য জানান। নির্বাচনে বগুড়া-৬ (সদর) আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন দলীয়প্রধান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আবিদুর রহমান ৯৭ হাজার ৬২৬ ভোট পেয়েছেন। এ আসনে ৭১ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা) আসনে বিএনপির কাজী রফিকুল ইসলাম ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৬১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন ৫৬ হাজার ৯৩৩ ভোট পেয়েছেন। এই আসনে ৬২ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী মীর শাহে আলম ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী মওলানা শাহাদাতুজ্জামান পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫৪৮ ভোট পেয়েছেন।
এই আসনে জাতীয় নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না কেটলি প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৩ হাজার ৪২৬ ভোট। এ আসনে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮০২ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। যা শতকরায় ৭২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। বগুড়া-৩ (দুপচাঁচিয়া ও আদমদীঘি) আসনে বিএনপির আব্দুল মহিত তালুকদার জয়লাভ করেছেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ২৭ হাজার ৪০৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নূর মোহাম্মদ ১ লাখ ১১ হাজার ২৬ ভোট পেয়েছেন। এ আসনে ১১৮টি কেন্দ্রে ২ লাখ ৪১ হাজার ৭১৬ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন যা শতকরায় ৭২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনে বিএনপির মোশারফ হোসেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী মোস্তফা ফয়সাল পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৯৭৮ ভোট। এ আসনে ১১৫টি কেন্দ্রে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৮ জন ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, যা শতকরা ৭৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। একইভাবে বগুড়া-৫ (শেরপুর- ধুনট) আসনে বিএনপির প্রার্থী জিএম সিরাজ ২ লাখ ৪৮ হাজার ৮৪১ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী দবিবুর রহমান ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩২৯ ভোট পেয়েছেন। বগুড়া-৫ আসনে মোট ৪ লাখ ৬৪৪ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। যা শতকরায় ৭১ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এছাড়াও বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে বিএনপি প্রার্থী মোরশেদ মিলটন ধানের শীষ প্রতীকে ২ লাখ ৬২ হাজার ৫০১ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মওলানা গোলাম রব্বানী। তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ১৮৪ ভোট । এই আসনে মোট কেন্দ্র ১৭৩টি মোট ৩ লাখ ৮০ হাজার ২৫০ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। যা শতকরায় ৭১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা তৌফিকুর রহমান জানান, ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী সাতটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন এবং সব ফলাফলে পোস্টাল ব্যালটের ভোট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পরে মোরশেদ মিলটনকে এই আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। দলীয় সূত্রে জানা যায়, খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে বগুড়া-৭ আসন থেকে জয়ী হন। ফলে এটি 'খালেদা জিয়ার আসন' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এদিকে ২০০১ সালের পর এটিই বড় ধরনের বিজয়। এর আগে ২০০৮ সালে বিএনপি বগুড়ার দুটি আসনে পরাজিত। সেই পরাজয়ের ২৫ বছর পর বিএনপি এবার সাতটি আসনেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী একেএম মাহবুবর রহমান জানান, বগুড়ায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে গত ১৮ বছর দৃশ্যত কোন উন্নয়ন হয়নি। শিক্ষা জীবন শেষ করেও চাকরি পায়নি অনেকেই। থেকেছে বেকার।
অন্য জেলার বাসিন্দারা চাকরি পেলেও বগুড়ার বাসিন্দারা চাকরি পাননি। করা হয়নি দৃশ্যমূলক কোন উন্নয়ন। বগুড়া নাম শুনেই বাদ পড়েছে অনেক কিছু। এবার বঞ্চিত বগুড়ার উন্নয়নে হাল ধরতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিজয়কে স্বাগত জানিয়েছেন জেলাবাসী। তিনি বলেন, রাজনীতিতে তারেক রহমানের অভিষেক হয় বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান বগুড়ার নিভূত পল্লী গাবতলী উপজেলা থেকে। ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার প্রার্থী হয়েছিলেন মা বিএনপি সাবেক চেয়ারপার্সন মরহুম বেগম খালেদা জিয়া। ওই নির্বাচনী প্রচারই ছিল তারেক রহমানের দলীয় কার্যক্রম। তখন গাবতলী থানা বিএনপির একজন সদস্য থাকলেও পরে তাকে জেলা কমিটির সদস্য করা হয়। দলে গোপন ব্যালটে নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতি ফিরিয়ে এনে তারেক রহমান বগুড়াকে সাংগঠনিক মডেল জেলায় রুপান্তর করেন। দলকে গুছিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দেশের জন্যও কাজ শুরু করেন। ২০০৭ সালে এসে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ হয়ে উঠায় নানা ঘটনার জন্ম হয়। এরপর তিনি দীর্ঘসময় নির্বাসনে জীবন কাটান। বাবা ও মায়ের পর ছেলে তারেক রহমানের এই বিজয় ইতিহাস হয়ে থাকবে।
