আকবর হায়দার কিরন

 নিউইয়র্কের ‘Poetry at Sunnyside Arts Reading & Open Mic’ -এ ফিচারড পোয়েট মনিজা রহমান  নিউইয়র্ক সিটির কুইন্স বরোর সানিসাইড—শিল্প, সংস্কৃতি ও বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের এক প্রাণবন্ত জনপদ। এখানকার স্কিলম্যান অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত The Arts Center-এ প্রতি মাসে বসে কবিতা ও সাহিত্যপ্রেমীদের বহুল প্রতীক্ষিত আয়োজন Sunnyside Arts Reading & Open Mic। কবি, লেখক ও সাহিত্যপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হওয়া এই অনুষ্ঠানের প্রাণপুরুষ লরা সালভাতোরে (Laura Salvatore)। ওপেন মাইকের পাশাপাশি প্রতিবার তিনজন নির্বাচিত কবিকে ফিচারড পোয়েট হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁরা ১৫ মিনিট ধরে নিজেদের সৃষ্টিকর্ম পাঠ করেন এবং শ্রোতাদের সঙ্গে ভাগ করে নেন তাঁদের সাহিত্যভাবনা।  সাম্প্রতিক আয়োজনে ফিচারড পোয়েট ছিলেন বাংলাদেশি লেখক ও কবি মনিজা রহমান, নিক এনজি এবং জেন ম্যাকব্রাইড।  বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনে মনিজা রহমান এক অগ্রগণ্য নাম। দেশের প্রথম নারী ক্রীড়া সাংবাদিক এবং প্রথম নারী স্পোর্টস এডিটর হিসেবে তিনি ইতোমধ্যেই ইতিহাসের অংশ। দীর্ঘদিন দৈনিক মানবজমিন ও দৈনিক জনকণ্ঠ-এ ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার পর ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন-এর স্পোর্টস এডিটরের দায়িত্ব পালন করেন। তবে সাংবাদিকতার ব্যস্ততার মধ্যেও সাহিত্যচর্চা কখনো থেমে থাকেনি।  ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ। এরপর গত ১৮ বছরে প্রকাশিত হয়েছে মোট ১৮টি বই। ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে পাড়ি জমানোর পর লেখালেখি যেন নতুন এক পরিসর পায়। তিনি যুক্ত হন প্রবাসের অন্যতম সাহিত্য সংগঠন ‘সাহিত্য একাডেমি’র সঙ্গে এবং ২০১৫ সাল থেকে সংগঠনটির নিয়মিত সাহিত্য আসরে অংশ নিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরির সাহিত্য আয়োজন ‘লেখকের অঙ্গন’-এরও একজন নিয়মিত মুখ।

প্রবাসে এসে তিনি শুধু বাংলা সাহিত্যচর্চাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; যুক্ত হয়েছেন নিউইয়র্কের মূলধারার ইংরেজি সাহিত্যাঙ্গনের সঙ্গেও। গত চার বছর ধরে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন First Tuesday ও Queens Poets-এর কবিতা পাঠের বিভিন্ন আসরে।  সম্প্রতি তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাহিত্য ও দর্শন বিষয়ক জার্নাল The Branches-এর স্প্রিং সংখ্যায়। সেই প্রকাশনাই তাঁকে এনে দেয়  Sunnyside Arts Reading & Open Mic-এর ফিচারড পোয়েট হওয়ার সম্মান।  অনুষ্ঠানে মনিজা রহমান পাঠ করেন পাঁচটি কবিতা—Why I Never End Up Going Anywhere, Another Darkness, Draft of a Missing Notice, Ornithology এবং The Story of the Sauna Room। প্রতিটি কবিতায় উঠে আসে মানুষের অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি, অভিবাসী জীবনের অনুভব, হারিয়ে যাওয়া সময় এবং অস্তিত্বের নানা অনুচ্চারিত প্রশ্ন। তাঁর সংযত অথচ আবেগঘন উপস্থাপনা পুরো পরিবেশকে করে তোলে গভীর মনোযোগী।  কবিতা পাঠের বাইরে নিজের লেখকজীবনের কথাও বলেন তিনি। তুলে ধরেন তাঁর শিকড়ের গল্প, বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা এবং ভাষার ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক সেই আসরে বাংলা ভাষার ইতিহাস এবং ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের কথা শ্রোতাদের সামনে তুলে ধরেন তিনি, যা উপস্থিত অনেকের কাছেই ছিল নতুন ও অনুপ্রেরণাদায়ক এক অভিজ্ঞতা।  অনুষ্ঠানের একটি আবেগঘন মুহূর্ত ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি স্মৃতিচারণ। তিনি জানান, অনুষ্ঠানের আগের দিন, ২৩ জুলাই, ছিল তাঁর বিবাহিত জীবনের ২৫তম বর্ষপূর্তি। নিজের সাহিত্যযাত্রার প্রতিটি বাঁকে নিরন্তর প্রেরণার জন্য স্বামী মনির হায়দারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর এই ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ শ্রোতাদেরও স্পর্শ করে।

 কবিতা পাঠ শেষে বিভিন্ন দেশের কবি, লেখক ও সাহিত্যপ্রেমীরা মনিজা রহমানের কবিতার বিষয়বস্তু, ভাষার গভীরতা এবং শিল্পিত উপস্থাপনার উচ্চ প্রশংসা করেন। অনেকেই তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সার্বজনীন মানবিক অনুভূতির মেলবন্ধনকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।  প্রবাসের মাটিতে এমন একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য আসরে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের একজন লেখকের শক্তিশালী উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গর্বের। মনিজা রহমানের এই অংশগ্রহণ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের বহুস্বরিক পরিসরে আরও দৃশ্যমান করে তোলার একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।