১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহারের প্রতিবাদে রাজশাহী থেকে চাপাই-নবাবগঞ্জের কানসাট সিমান্ত পর্যন্ত এই গণসমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশের মানুষের পানি অধিকারের দাবী জনসমক্ষে তুলে ধরেন। লংমার্চের পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সরকার গঙ্গার পানি সমস্যা জাতিসংঘে উত্থাপন করেন। এবং তার প্রেক্ষিতে ১৯৭৭ সালের গঙ্গা পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এবছর ডিসেম্বরে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গংগা পানি চুক্তি তামাদি হবে। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি (আইএফসি)-এর নেতৃবৃন্দ শুক্রবার দেয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, এবার লংমার্চ দিবসের শপথ হবে বর্তমান চুক্তির ত্রæটি-বিচ্যুতি দূর করে ডিসেম্বরের আগেই সংশোধনীসহ চুক্তি নবায়ন বা নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য জনমতের চাপ গড়ে তোলা। ফারাক্কার উজানে ইতিপূর্বে নির্মিত বিভিন্ন বাঁধ থেকে উত্তোলিত পানি ব্যবহারের বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত না করায় ১৯৯৬ সালের চুক্তিটি ট্রূটিপূর্ণ ছিল। এক সমীক্ষায় দেখা যায় এর ফলে বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তি এই মেয়াদে শতকরা ৩০ ভাগ কম ছিল। চুক্তি বাস্তবায়নের প্রথম বছরে (১৯৯৭) বাংলাদেশে গঙ্গার পানি প্রবাহ ৩৫,০০০ কিউসেকের স্থলে প্রায় ৬,০০০ কিউসেকে নেমে এসেছিল। উজানে বেহিসেবে পানি ব্যবহার করলে ফারাক্কায় পানি নাও আসতে পারে।
এই শঙ্কার কথা বাংলাদেশের পরিবেশবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই জানিয়েছিলেন। গঙ্গার পানির বিষয়ে এখন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। শুস্ক মওসুমে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করে তিস্তা নদীর পানি গঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিগত দুই যুগ ধরে। বাস্তবায়িত হচ্ছে ভারতের আন্তনদী সংযোগ পরিকল্পনা। বাদবাকি ৫২টি যৌথ নদীর উজানেও বাঁধ বা জলাধার নির্মান করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের প্লাবন ভূমিতে এখন আর বার্ষিক প্লাবন আসেনা। অন্যদিকে তিস্তা অববাহিকায় প্রতিবছর এবং মেঘনা অববাহিকায় নিয়মিত ধংসাত্মক বন্যা নেমে আসে। এদিকে গঙ্গা ও তিস্তার পানি বঞ্চিত হওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে পরিবেশগত বিপর্যয়।
এসব অঞ্চলে ছোট ছোট নদিগুলো মরে গেছে। ক্ষতগ্রস্ত হয়েছে পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীবিকা, জীববৈচিত্র ও জীবচক্র। নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে মানবজাতির জন্য বিশ্ব-ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির নেতৃবৃন্দ বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশ হাজারো বছর ধরে ৫৭টি যৌথ নদীর বয়ে আনা পলিসৃষ্ট। পূর্ব-হিমালয়ের সকল নদী বাংলাদেশের উপর দিয়ে বংগোপসাগরে পতিত হয়। উজানে বাঁধ ও জলাধার নির্মানের ফলে এই নদীগুলোর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশের ভৌগলিক এবং পরিবেশগত অস্তিত্ব হুমকীর মুখে পড়েছে। বর্তমানে অনুসৃত নদী, পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র ও জীবচক্র বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি মেনে চললে প্রকৃতিক নদীর প্রবাহ মানবসৃষ্ট রাজনৈতিক বর্ডারে আটকে দেয়া যায়না। নদীর সার্ভিস পেতে হলে তাকে উৎস থেকে সাগর পর্যন্ত প্রবাহমান রাখতে হবে।
৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি বলবত থাকা সত্তে¡ও প্রবাহ যাথেষ্ট না হওয়ায় গঙ্গার পানি গোড়াইসহ তার শাখা নদিগুলোতে নিয়ে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয়ের কোন সুরাহা করা যায়নি। তাই সরকার বাংলাদেশে গঙ্গার উপর বাঁধ নির্মানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গঙ্গার সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কাঠামো না থাকলে এই ব্যারেজেও শুকনো মওসুমে পানি আসবেনা। তাই নদীমাতৃক বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে বেসিন-ভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যৌথ নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার এবং এদেশের মানুষের নদী-পানির অধিকার রক্ষার সংগ্রাম মাওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চ থেকে শিক্ষা নিয়ে জোরদার করতে হবে। যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন আইএফসি নিউইয়র্ক চেয়ারম্যান সৈয়দ টিপু সুলতান, মহাসচিব মোহাম্মদ হোসেন খান, আইএফসি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক জসীম উদ্দিন আহমদ, সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাহমুদ হাসান।
