সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমানের প্রথম বড় আকারের সাংবাদিক সম্মেলন দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রবীণ সাংবাদিক মনজুর আহমদের একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখা পড়ার পর প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে—আমরা কি বারবার একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছি? দৃশ্যপট বদলায়, নাম বদলায়, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি বদলায়? মনজুর আহমদ যথার্থই লিখেছেন, “সাংবাদিক সম্মেলনে হাততালি দেওয়া বেমানান।” এটি নিছক ভদ্রতার প্রশ্ন নয়; এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও পেশাদার সাংবাদিকতার মৌলিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে বিষয়টি নতুন নয়। নব্বইয়ের দশকে খালেদা জিয়ার সাংবাদিক সম্মেলনে দলীয় কর্মীদের করতালি নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। দুই হাজারের দশকে শেখ হাসিনার সাংবাদিক সম্মেলনেও একই দৃশ্য দেখা গেছে।

সময় বদলেছে, মুখ বদলেছে—কিন্তু হাততালির সংস্কৃতি বদলায়নি। ২০২৪ সালেও আমরা সেই একই চিত্র প্রত্যক্ষ করছি। এই পুনরাবৃত্তির পেছনে তিনটি স্তরের ব্যর্থতা স্পষ্ট। প্রথমত, নেতৃত্বের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। সাংবাদিক সম্মেলন কোনো দলীয় সভা নয়; এটি গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রশ্নোত্তরের একটি পেশাদার পরিসর। সেখানে করতালি নয়, প্রশ্নই মুখ্য হওয়া উচিত। কিন্তু অনেক সময় নেতৃত্বই করতালিকে নীরবে অনুমোদন দেন, কারণ এটি সমর্থনের প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়। দ্বিতীয়ত, দলীয় কর্মীদের রাজনৈতিক পরিপক্বতার অভাব। নেতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের স্থান সমাবেশ বা দলীয় অনুষ্ঠান—সাংবাদিক সম্মেলন নয়। তবুও দেখা যায়, নেতার বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই করতালিতে হল মুখরিত হয়ে ওঠে। এতে পরিবেশটি সংবাদমাধ্যমের বদলে প্রচারণামূলক হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, সাংবাদিক সমাজের নীরবতা।

পেশাদার সাংবাদিকতার মূল শক্তি প্রশ্ন করার সাহস। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, করতালির এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হয় না। ফলে শিষ্টাচার ভঙ্গের বিষয়টি স্বাভাবিক রূপ পায়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর প্রভাবও বিবেচ্য। বিদেশি সাংবাদিক বা পর্যবেক্ষকরা যখন দেখেন—নেতার আত্মপ্রশংসায় করতালি, রাজনৈতিক অঙ্গীকারে উচ্ছ্বাস—তখন তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক পরিণততা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। একটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি গঠনে এমন দৃশ্য ইতিবাচক বার্তা দেয় না। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সাংবাদিক সম্মেলনে ব্যক্তিগতভাবে তিনি সংযত ছিলেন, আবেগতাড়িত হননি এবং বক্তব্যে শৃঙ্খলা বজায় রেখেছেন।

এটি একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হতে পারত। কিন্তু দলীয় কর্মীদের করতালি সেই পেশাদার পরিবেশকে আংশিকভাবে আড়াল করেছে। এতে নেতার রাজনৈতিক বার্তার চেয়ে পরিবেশই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। তবে এটি কেবল একটি দলের সমস্যা নয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি—প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই একই চিত্র দেখা গেছে। অতএব, বিষয়টি দলীয় নয়; এটি সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন। পরিবর্তন চাইলে কিছু স্পষ্ট পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সাংবাদিক সম্মেলনের শুরুতেই ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে—এটি প্রশ্নোত্তরের পরিসর, করতালির স্থান নয়।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কর্মীদের গণমাধ্যম শিষ্টাচার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সাংবাদিক সংগঠনগুলোকেও পেশাগত মানদণ্ড রক্ষায় আরও দৃঢ় হতে হবে। গণতন্ত্রের পরিণততা বড় বড় ভাষণে নয়, ছোট ছোট আচরণে প্রকাশ পায়। সাংবাদিক সম্মেলনে করতালি বন্ধ করার মতো একটি সামান্য বিষয়ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নের সূচনা হতে পারে। আমরা কি একই পুনরাবৃত্তি চাই, নাকি একটি পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতি? সিদ্ধান্ত আমাদেরই।

নিউ ইয়র্ক ১৪ ফেব্রুয়ারি