তারেক রহমানের কণ্ঠ একসময় হারিয়ে গিয়েছিল। যা বাংলাদেশের মতো ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের একটি দেশের সম্ভাব্য নেতা হিসেবে মোটেও আদর্শ ঘটনা নয়। এদিকে এই ঘটনা বিদ্রূপের সঙ্গেও মিশে আছে, কারণ নিজ দেশের গণমাধ্যমে তারেক রহমানের বক্তৃতা প্রচার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে এভাবেই সংবাদের সূচনা লিখেছে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন। ২৮শে জানুয়ারি প্রকাশিত তারেক রহমানের সাক্ষাৎকারে দেশের সামপ্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জের নানা বিষয় উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটির শিরোনাম- ‘বাংলাদেশ’স প্রোডিগাল সন’। এতে বলা হয়, দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর গত ২৫শে ডিসেম্বর নিজ মাতৃভূমিতে পা রেখেছেন তারেক রহমান। দেশে ফিরে টাইম ম্যাগাজিনের সঙ্গেই প্রথম কথা বলেছেন তিনি। বলেছেন, বর্তমানে তিনি এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছেন। নিজের বাড়ির সামনে যে স্থানে বসে সাক্ষাৎকার দেন সেখানে তার চারপাশে ছিল বাগানবিলাস আর গাঁদা ফুলের পরিবেশ। বিএনপি’র চেয়ারম্যান নিজের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন, আসলে আমি খুব ভালো বলতে পারি না, তবে আমাকে কিছু করতে বললে তা সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করি। বিজ্ঞাপন গত কয়েক সপ্তাহ তারেক রহমানের জন্য সময়টা রীতিমতো ঝড়ের মতো ছিল। লাখ লাখ উচ্ছ্বসিত জনতার অভ্যর্থনায় গত ২৫শে ডিসেম্বর বাংলাদেশে পা রাখেন তিনি। এর ঠিক পাঁচ দিন পরই দীর্ঘ অসুস্থতার পর তার মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। যাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীতে বিপুল জনসমাগম হয়। এই স্মৃতি বলতে গিয়ে ছল ছল চোখে তারেক রহমান বলেন, আমার হৃদয় খুব ভারী লাগছে। তবে তার (খালেদা জিয়া) কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি তা হলো- যখন দায়িত্ব আসে, তখন তা পালন করতেই হয়।
হয়তো এ দায়িত্ব তারেক রহমানের মায়ের পথটাকেই অনুসরণ করা। শেখ হাসিনাকে ১৮ মাস আগে ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ঘোষিত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমানই স্পষ্টভাবে এগিয়ে থাকা প্রার্থী। তিনি নিজেকে উপস্থাপন করছেন এক সেতু হিসেবে। যার একদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর রাজনীতিক এলিট শ্রেণি, অন্যদিকে তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষা। সমস্যা অনেক, যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল মুদ্রা সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয়কে হ্রাস করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানি সীমিত করা হয়েছে, যা উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহকে দুর্বল করছে। এসব বাধা পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসীদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল বৈচিত্র্যময় অর্থনীতির জন্য অন্তরায়। বর্তমানে তরুণ বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। তবে তারেক রহমানকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। অনেকে মনে করেন, তার প্রধান যোগ্যতা হলো বংশীয় পরিচয়। তিনি খালেদা জিয়া ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক জিয়াউর রহমানের পুত্র। সমর্থকদের কাছে তারেক রহমান একজন নিপীড়িত মানুষ। যিনি দুর্দশাগ্রস্ত এই দেশকে রক্ষা করতেই ফিরে এসেছেন। সমালোচকরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেয়া এই নেতার একমাত্র যোগ্যতা জন্মসূত্রে পাওয়া। তারেক রহমান দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে চান।
তিনি বলেন, আমি আমার বাবা-মায়ের সন্তান বলে এখানে এসেছি তা নয়, বরং আমার দলই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে, বহু বাংলাদেশিই তাকে বিশ্বাস করতে প্রস্তুত। ডিসেম্বরের শেষ দিকে হওয়া জনমত জরিপে দেখা যায়, তার দল বিএনপি’র সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ১৯ শতাংশ। তবু উদ্বেগ রয়েছে। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি’র শাসনামলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টানা চার বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা আগের সাজাগুলো অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করেছে। সকল দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে তারেক রহমান বলেন, ওরা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি। সত্যিই, হাসিনার আমলে তার অনুগত সংবাদমাধ্যম তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে অভিযোগ প্রচার করে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী, এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নেয় একটি দেশ।
এটি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশও বটে। প্রতিবেশী মিয়ানমারে গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এই দেশেই আশ্রয় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বৈদেশিক বিনিয়োগকারী এবং প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। একইসঙ্গে বাংলাদেশ হাই-টেক উৎপাদনে এগোচ্ছে, যাতে স্যামসাংয়ের মতো কোম্পানি চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। তবে চীনও বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায়। আশা করা হচ্ছে, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো আবারো স্বৈরতন্ত্রে ফেরার ঝুঁকি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি করবে। একইসঙ্গে, দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনে তারেক রহমান নিজেকে পরিশীলিত ও পরিণত করেছেন কি না- সেটিও বড় প্রশ্ন। তারেক রহমান বলেন, যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের বিশাল দায়িত্ব আছে। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়। তারেক রহমানকে নরমস্বভাব ও অন্তর্মুখী মনে হয়।
তিনি কথা বলার চেয়ে শুনতেই বেশি পছন্দ করেন। লন্ডনে তার প্রিয় সময় কাটতো রিচমন্ড পার্কে হাঁটতে হাঁটতে, কিংবা ইতিহাসের বই পড়ে। তার প্রিয় সিনেমা এয়ার ফোর্স ওয়ান। তারেক হেসে বলেন, সম্ভবত এই সিনেমাটি আটবার দেখেছি। নীতিনির্ধারণে তিনি যেন এক ‘পলিসি ওনক’- যিনি কোনো বিষয়ে তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরতে পারেন। তারেক রহমান চান ১২ হাজার মাইল খাল খনন করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার করতে। প্রতি বছর ৫ কোটি গাছ লাগাতে, ঢাকায় ৫০টি নতুন সবুজ এলাকা তৈরি করতে। বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষ করতে টেকনিক্যাল কলেজ পুনর্গঠন, বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারিত্ব- সবই তার পরিকল্পনায় আছে। তিনি বলেন, আমার পরিকল্পনার যদি মাত্র ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারি, আমি নিশ্চিত মানুষ আমাকে সমর্থন করবে। এই টেকনোক্রেটিক ভাবমূর্তি তার পুরনো সমালোচনার সম্পূর্ণ বিপরীত। ঢাকা শহরে জন্ম নেয়া তারেক রহমান বিমান বাহিনীর একটি স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে আশির দশকের মাঝামাঝি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন।
কিন্তু দ্বিতীয় বর্ষেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। এরপর ব্যবসায় জড়ান এবং নব্বইয়ের দশকে বিএনপি’র রাজনীতিতে উঠে আসেন। একসময় দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ক্ষমতার কেন্দ্রে তার প্রভাব তাকে যেমন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, তেমনি বিতর্কিতও করে তোলে। দুর্নীতি ও প্রশাসনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৮৪টি মামলায় ১৮ মাস কারাভোগ করেন তারেক রহমান। নির্যাতনের ফলে তার মেরুদণ্ডে স্থায়ী সমস্যা হয়। চিকিৎসার জন্যই মূলত তিনি যুক্তরাজ্যে যান। তারেক রহমান বলেন, শীতে খুব ঠান্ডা হলে পিঠে ব্যথা বাড়ে। কিন্তু আমি এটাকে দায়িত্বের স্মারক হিসেবেই দেখি। দীর্ঘ সময় ধরে শেখ হাসিনার শাসনে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগোলেও রাষ্ট্র ক্রমশ দমনমূলক হয়ে ওঠে। গুম, নির্যাতন, সাংবাদিক নিপীড়ন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়। শেষে জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন সেই দমবন্ধ করা ব্যবস্থার বিলোপ ঘটায়। হাসিনার গণতন্ত্র হরণ তারেক রহমানের কাছে চরম বিদ্রূপের মতো মনে হয়।
বিশেষ করে যেখানে আন্দোলনকারীদের ওপর সাঁজোয়া যান এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। তারেক রহমান বলেন, যে-ই অপরাধী হোক না কেন, এই দেশে আইন ও নিয়ম রয়েছে। তাই তাদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। গত নভেম্বরে ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বিক্ষিপ্ত হামলার ঘটনাগুলোকে আওয়ামী লীগ বড় করে প্রচার করছে। আওয়ামী লীগ এবং ভারতের প্রভাবশালী মহল প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য লবিং চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেছে, যা দেশটির রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। তারেক রহমান জানান, তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায় খুঁজছেন এবং বোয়িং বিমান ও মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামো ক্রয়ের সম্ভাবনা তৈরি করে এই শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনার চেষ্টা করছেন। তারেক রহমান বলেন, ডনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন, আমি দেখবো আমার দেশের স্বার্থ। তবে আমরা একে অপরকে সাহায্যও করতে পারি।
আমি নিশ্চিত ট্রাম্প একজন অত্যন্ত যুক্তিবাদী মানুষ। তারেক রহমান বলেন, আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা। লন্ডনের কোন জিনিসটি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে? প্রশ্ন করতেই তারেক রহমান সোজাসুজি উত্তর দেন, আমার স্বাধীনতা। নিজের বাড়ির ১০ ফুট উঁচু কাঁটাতারের বেড়ার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, যখন আমি এই বাড়িতে এলাম এবং এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখলাম, আমার খুব দমবন্ধ লাগছিল। তবে তারেক রহমান অভিযোগ করছেন না। তিনি প্রমাণ করতে চান যে, তার এই ফেরা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশ ও জাতির কল্যাণে এক গভীর সংকল্পের ফল। আলোচনার ইতি টানতে গিয়ে তিনি তার প্রিয় চলচ্চিত্র ‘স্পাইডার ম্যান’-এর একটি উক্তি উল্লেখ করেন, ‘উইথ গ্রেট পাওয়ার কামস গ্রেট রেসপনসিবিলিটি’ (বৃহৎ ক্ষমতার সঙ্গেই বড় দায়িত্বটা চলে আসে)। তারেক রহমান মৃদু হেসে বলেন, আমি এই কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।
