কোনদিন যে কথা বলিনি। আজ বেগম খালেদা জিয়ার মৃত‍্যুর পর টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে বিষন্নতায় ডুবে গিয়েছিলাম। স্মৃতি আমাকে নিয়ে চলেছিল পেছনের দিনগুলিতে। ফিরে গিয়েছিলাম চুয়ান্ন বছর আগে। চুয়ান্ন বছর আগে আমি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম বেগম খালেদা জিয়ার। সেদিনের সেই না বলা কথাগুলি আজ বলা প্রয়োজন বলে মনে হলো। তখন ১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত হওয়ার পর বেগম জিয়া বেরিয়ে এসেছিলেন বন্দীদশা থেকে। খবর পেয়েই আমি গিয়েছিলাম তার বোনের শান্তিনগরের বাসায়। বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সেখানেই উঠেছিলেন। তার কাছে শুনেছিলাম তার কাহিনী। আর তার ভগ্নিপতির কাছে শুনেছিলাম তাদের উপর নির্যাতনের বিভৎস বিবরণ।

একাত্তরের ২ জুলাই পাক বাহিনী বেগম জিয়াকে তার সিদ্ধেশ্বরীর গোপন আস্তানা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। দুই শিশু সন্তান তারেক ও কোকো সহ তাঁকে ক‍্যান্টনমেন্টে এক সামরিক অফিসারের বাসার পেছন দিকের একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। বিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ জীবন। বাইরের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। কোন পত্রিকা তাকে দেয়া হয় না, টেলিভিশন নেই, কোন রেডিও নেই। শুধু একজন পরিচারক তাকে খাবার দিয়ে যেত। সে কোন কথা বলত না। এই ছিল বেগম জিয়ার বন্দী জীবন। তখন তার একমাত্র পরিচয় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাদানকারী, মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনানী, প্রথমে সেক্টর কমান্ডার পরে তার নামে গঠিত জেড ফোর্সের প্রধান মেজর জিয়াউর রহমানের স্ত্রী।

সাক্ষাৎকারে সেদিন বেগম জিয়ার কাছ থেকে তার  একাত্তরের নয় মাসের জীবনের এক শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী শুনেছিলাম। সে কাহিনী দৈনিক বাংলার পেছনের পাতায় বড় করে ছাপা হয়েছিল। সেটিই ছিল পত্রিকায় প্রকাশিত বেগম জিয়ার প্রথম সাক্ষাৎকার। লেখাটি পরে আমার ‘একাত্তর কথা বলে’ বইয়ে সংকলিত হয়েছে। সঙ্গে ছাপা হয়েছে দৈনিক বাংলার খ‍্যাতিমান আলোকচিত্র সাংবাদিক গোলাম মাওলার তোলা দুই শিশু সন্তান পিনো আর কোকোকে দুই পাশে নিয়ে বেগম জিয়ার সেদিনের ছবি। বেগম জিয়ার এই সাক্ষাৎকারটি তেমন আলোচিত নয়, যেমন আলোচিত আমার নেয়া জিয়াউর রহমানের সাক্ষাৎকার।

আজ বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর সেই আশির দশকে আগামী প্রকাশনীর প্রকাশ করা আমার ‘একাত্তর কথা বলে’ বই থেকে  বেগম জিয়ার সাক্ষাৎকারটি বের করলাম। নতুন করে পড়লাম। নতুন করে শিহরিত হলাম। মনে হলো এ কাহিনী সবার জানা উচিত। অনেক অপপ্রচার, অনেক কুৎসা বেগম জিয়া সম্পর্কে রটানো হয়েছে। সে সব অপপ্রচারের জবাব এই লেখাটি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়া জিয়াউর রহমান যখন কালুরঘাট ব্রিজ পার হয়ে ওপারে আস্তানা গেঁডেছেন তখন শত্রু কবলিত চট্টগ্রাম থেকে বেগম জিয়া বোরখা পরে গোপনে নৌপথে পালিয়ে এসেছিলেন নারায়ণগন্জে। আসার আগে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন তার ভগ্নিপতি মোজাম্মেল হকের সাথে। মোজাম্মেল হক  তখন ছিলেন শিল্পোন্নয়ন ব্যাংকের সিনিয়ার কোঅর্ডিনেশন   অফিসার। তার স্ত্রী খুরশিদ জাহান হক, যিনি চকলেট আপা নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। রেডক্রসের ছাপ দেয়া এক গাড়ি নিয়ে জনাব হক ১৬ মে কার্ফু কবলিত নারায়ণগন্জ থেকে বেগম জিয়াকে এনে তার বাসায় তোলেন। কিন্তু দু’দিনের মধ‍্যেই টের পান বিপদ ঘনিয়ে আসছে। বিপদ এড়াতে পারেননি বেগম জিয়া এবং মোজাম্মেল হক। বেগম জিয়াকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে নিয়ে লুকিয়ে রাখা হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ১ জুলাই জিওলজিকাল সার্ভে’র ডেপুটি ডিরেক্টর এস কে আবদুল্লাহর সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে ধরা পড়ে যান বেগম জিয়া। একই সাথে গ্রেফতার করা হয় জনাব আবদুল্লাহকেও। গ্রেফতার করা হয় জিওলজিকাল সার্ভে’র অ‍্যাসিস্ট‍্যান্ট ডিরেক্টর মুজিবুর রহমানকেও।

বেগম জিয়া সিদ্ধশ্বরী আসার আগে তার বাসাতেও ক’দিন ছিলেন। ৫ জুলাই মোজাম্মেল হকও ধরা পড়েন। ক‍্যান্টনমেন্টে যে নির্মম নির্যাতনের শিকার তারা হয়েছিলেন সেই কাহিনীই আমি সেদিন মোজাম্মেল হকের কাছে শুনেছিলাম। দৈনিক বাংলায় দুজনেরই সাক্ষাৎকার পেছনের পাতায় বড় করে পাশাপাশি ছাপা হয়েছিল। এ সাক্ষাৎকার আজ বিস্মৃতির অতলে। বেগম জিয়াকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করতে গিয়ে সেদিনের স্মৃতিতেই আমি ভারাক্রান্ত হলাম। এখানে তুলে ধরলাম সেই সাক্ষাৎকার থেকে কিছু কথা। আর দিলাম দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে তোলা বেগম জিয়ার সেদিনের ছবিটা।