ইরান সংকট নিয়ে বিপাকে ট্রাম্প, সংঘাত নাকি সমঝোতা প্রশ্নে সিদ্ধান্তহীনতা
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ষষ্ঠ মাসে পা দেওয়ায় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংঘাতের পথ থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি তিনি।

ইরানের বিপক্ষে চলমান যুদ্ধ ষষ্ঠ মাসে প্রবেশ করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন। দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার অঙ্গীকার করলেও বর্তমানে তিনি বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্পের মুখোমুখি হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতামত অনুযায়ী, ট্রাম্পের সামনে এখন মূল পথ রয়েছে তিনটি। এর মধ্যে রয়েছে ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানের প্রস্তাব মেনে নেওয়া, নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা পরিচালনা অথবা বিদ্যমান অচলাবস্থাই ধরে রাখা।
একটি সম্ভাব্য চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জলযানের ওপর ইরানের তদারকির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে যুদ্ধ শুরুর পর তেহরানের জন্য এটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর আগে এই প্রণালিটিতে আন্তর্জাতিক নৌযানের গমনাগমনে কোনো ধরনের বাধা বা ফি ছিল না।
অপরদিকে, নতুন করে জোরালো বিমান হামলার পদক্ষেপ নিলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে। আসছে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পূর্বে এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াবে, কারণ আমেরিকার অধিকাংশ নাগরিক দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের পক্ষে নন। ফলে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে।
অন্য পথটি হলো বিদ্যমান অবস্থা বজায় রাখা, অর্থাৎ ইরানি বন্দরে অবরোধ বজায় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জবাব দেওয়া। তবে এতে করে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার যে প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা রক্ষা করা কঠিন হবে। আমেরিকার সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কূটনৈতিক প্রতিনিধি অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ট্রাম্পের সামনে সহজ কোনো রাস্তা নেই এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য এই লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলেও তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন।
আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট করেছেন যে, হরমুজ প্রণালিকে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে রাখতে হবে এবং সেখানে ইরানের কোনো তদারকি বা শুল্ক আদায় মেনে নেওয়া হবে না। তবে আগের অভিজ্ঞতা বলে, ট্রাম্প অনেক সময় প্রশাসনের ঘোষিত অবস্থান থেকে সরে এসে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।
উচ্চ জ্বালানি মূল্য, ট্রাম্পের কমতে থাকা গ্রহণযোগ্যতা এবং যুদ্ধবিরোধী জনমতের কারণে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হয়ে এসেছে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের ধারণা, আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত এই অবস্থা গড়ায় কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যদিও ট্রাম্পের দাবি, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সামরিক শক্তি ধ্বংস করে আমেরিকা সাফল্য পেয়েছে, কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য এখনও অর্জিত হয়নি।
গত শনিবার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের অনুরোধে ট্রাম্প সম্ভাব্য বড় হামলা পিছিয়ে দিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাকে সময় দেওয়ার কথা জানান। তবে সমঝোতা না হলে ফের সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে, যা অবশ্য প্রেসিডেন্ট অস্বীকার করেছেন।
এদিকে ইরান সতর্ক করেছে, আমেরিকা নতুন হামলা চালালে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানা হবে। আমেরিকার সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন পানিকফ জানান, এই সংঘাত চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে তারা আমেরিকার সামরিক সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের বিশেষজ্ঞ বেহনাম বেন তালেবলু তাড়াহুড়ো না করে কৌশলগত প্রভাব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
