আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৫৬ এএম

সাইফুর রহমান ওসমানী জিতু
লস এঞ্জেলেস, ২৯শে জুন, ২০২৬ঃ সোনার কাঠির ছোঁয়ায় লাখো তরুণের আলোর দিশারী বাংলা টেলিভিশন শিল্পের সৃজনশীল কাজের জনক, কিংবদন্তি মহানায়ক মুস্তফা মনোয়ারের মহাপ্রস্থান! চলে গেলেন বাংলাদেশ টেলিভিশন ও পুতুলনাট্য শিল্পের পথিকৃৎ, একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য শিল্পী আমাদের প্রিয় মুস্তাফা মনোয়ার (মন্টু ভাই)। আলোর দিশারী থেকে স্মৃতির আকাশে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও শিল্পাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার (১৯৩৫ - ২০২৬) গেলো সোমবার ২৯ জুন সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
অনেকের কাছে তিনি অত্যন্ত স্নেহভাজন ‘মন্টু ভাই’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। চিত্রকলা, টেলিভিশন নাটক, এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে নতুন শিল্প আঙ্গিক ‘পাপেট’ বা পুতুলনাট্যের জনক হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। দ্বিতীয় সাফ গেমসের অফিশিয়াল মাসকট ‘মিশুক’ নির্মাণ কিংবা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের সেই রক্তিম সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনাসহ আমাদের সংস্কৃতির বহু ঐতিহাসিক অধ্যায়ে জড়িয়ে আছে তাঁর অনন্য সৃষ্টিশীলতা। শিল্পী গোলাম মোস্তফার সুযোগ্য সন্তান মুস্তাফা মনোয়ার কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। দেশে ফিরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পরামর্শে আর্ট কলেজে শিক্ষকতা শুরু করলেও, পরবর্তীতে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশন (বর্তমানে বিটিভি)-এ যোগ দিয়ে গণমাধ্যমে এক নতুন যুগের সূচনা করেন।
শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৪ সালে রাষ্ট্র তাঁকে ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। ব্যক্তিগত জীবন থেকে তাঁর সাথে জড়িয়ে আছে কিছু অমূল্য স্মৃতি। ৬০-এর দশকে সাদা-কালো টেলিভিশনের যুগে ডিআইটি স্টুডিওতে প্রযোজিকা বদরুন্নেসা আবদুল্লাহর ছোটদের গানের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে দূর থেকে প্রথম দেখেছিলাম এই গুণী মানুষকে। তখন তাঁর সাথে ছিলেন সৈয়দ মোস্তফা কামাল, ইকবাল বাহার চৌধুরী, মাসুমা খাতুন, সাকিনা সারোয়ার, সরকার ফিরোজ, খালেদা ফাহমীর মতো টেলিভিশন তারকারা।
লস এন্জেলেস শহরে মুস্তফা মানোয়ার
৮০-এর দশকে মুস্তফা মনোয়ার একবার লস অ্যাঞ্জেলেসে আসেন, তখন তাঁর সাথে খুব কাছ থেকে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়। সে সময় আমি প্রবাসীদের জন্য ‘ভয়েস অফ বাংলাদেশ, লস অ্যাঞ্জেলেস’ (ভিওবি) এর ব্যানারে KFOX-93.5FM-এ একটি বাংলা বেতার অনুষ্ঠান পরিচালনা করতাম। আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য প্রচারিত বেতার অনুষ্ঠানে একটি সাক্ষাৎকার গ্রহনের অনুরোধ জানালে তিনি সানন্দে রাজী হন। বেতার ও টেলিভিশনের প্রতি তাঁর আজন্ম কৌতূহলের কারণে আমাদের অনুষ্ঠানটি নিয়ে তিনি দারুণ আগ্রহ দেখান। আমাদের বেতার কেন্দ্রটি ছিলো প্রশান্ত মহাসাগর সংলগ্ন‘রেডান্ডো বিচ’ নামে সমুদ্র সৈকতের কাছে। লস এন্জেলেস শহরে আমার বাসা থেকে বেশ কিছু দূরে। রেকর্ডিং’র সুবিধার্থে ছোট-খাট একটি মিনি স্টুডিও তৈরি করেছিলাম আমার বাসায়।
সাক্ষাৎকার গ্রহনের দিনে মুস্তাফা ভাইকে যথাসময় হোটেল থেকে আমার বাসায় গাড়ি করে আসার পথে গাড়ির ক্যাসেট প্লেয়ারে আমাদের বেতারের প্রচারিত অনুষ্ঠান বাজিয়ে শোনাচ্ছিলাম। ভূয়সী প্রশংসা করলেন আমাদের বেতার অনুষ্ঠানের মান শুনে। মুস্তাফা মনোয়ারের কাছ থেকে, এ মন্তব্য ছিলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। আমার বাসায় ঢুকেই চোখে নজর পড়লো আমার ঘরে রাখা ঘরের কোনে রাখা একটি কী-বোর্ডের ওপর। একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন কী-বোর্ড বাজাতে।যথারীতি মুস্তফা ভাইয়ের দূ’জনে দূ’টি চেয়ারে বসে সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হলো।
লস অ্যাঞ্জেলেসে বেড়াতে এসে আমাদের সীমিত প্রযুক্তির ঘরে বসে করা সেই রেকর্ডিং ও অনুষ্ঠানের মান দেখে তিনি দারুণ প্রশংসা করেছিলেন। মুস্তাফা ভাই ভেবেছিলেন আমাদের বেতার স্টুডিও বেশ বড়সড় কোন স্টুডিও হবে। কিন্তু বাসায় এসে, তিনি বেতার অনুষ্ঠান ধারণের আয়োজন দেখে বেশ অবাকই হলেন! লস এন্জেলেস শহরে গ্রিফিথ পার্কে প্রবাসী বাংলাদেশীদের দ্বারা আয়োজিত বনভোজনে তাঁর সাথে কাটানো সেই আনন্দঘন মুহূর্ত আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। তিনি ছিলেন এক আলোকিত মানুষ, আমাদের সংস্কৃতির সত্যিকারের আলোর দিশারী। আমরা এক অপূরণীয় প্রতিভাকে হারালাম। মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন মুস্তাফা মনোয়ার ভাইকে বেহেশত নসীব করেন। আমিন।