আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ১২ জুন, ২০২৬, ১২:০৯ এএম

বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর যুগে প্রবেশ করেছে। আমাদের প্রতিদিনের জীবন, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি—সবকিছুই আজ নির্ভর করছে তথ্যপ্রযুক্তির ওপর। এই বিশাল ডিজিটাল বিপ্লবের পেছনে কাজ করছে অদৃশ্য এক শক্তি—ডাটা সেন্টার। আর সেই ডাটা সেন্টার শিল্পের বিশ্বমানের অন্যতম সফল উদ্যোক্তার নাম রবিন খুদা। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি আজ অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং বিলিয়নিয়ার। তাঁর প্রতিষ্ঠিত AirTrunk বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৃহত্তম হাইপারস্কেল ডাটা সেন্টার কোম্পানিগুলোর একটি।
তাঁর জীবনগাথা শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প নয়; এটি একজন অভিবাসীর সংগ্রাম, দূরদর্শিতা এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার কাহিনি। শৈশব ও স্বপ্নের শুরু রবিন খুদার জন্ম ঢাকায়। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বাংলাদেশেই। সে সময় হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি যে একদিন বিশ্বের প্রযুক্তি শিল্পে তাঁর নাম সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান উচ্চশিক্ষা ও উন্নত জীবনের সন্ধানে। নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন পরিবেশ—সবকিছুই ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জকে তিনি পরিণত করেন সুযোগে। অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা শেষ করে তিনি টেলিকমিউনিকেশন ও প্রযুক্তি খাতে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন যে ভবিষ্যতের পৃথিবী পরিচালিত হবে তথ্য ও ডাটার মাধ্যমে।
একটি সাহসী সিদ্ধান্ত ২০১৫ সালে রবিন খুদা প্রতিষ্ঠা করেন AirTrunk। তখনও অনেকেই বুঝতে পারেননি যে ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডাটা সেন্টারের বাজার কত বড় হতে যাচ্ছে। Amazon, Google, Microsoft, Meta-এর মতো প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো যখন দ্রুত সম্প্রসারণ শুরু করে, তখন তাদের প্রয়োজন হয় বিশাল আকারের ডাটা সেন্টার। রবিন খুদা সেই চাহিদা আগেভাগেই উপলব্ধি করেছিলেন। AirTrunk-এর লক্ষ্য ছিল বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য অত্যাধুনিক ডাটা সেন্টার তৈরি করা। শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রবিন খুদা উল্লেখ করেছেন যে ব্যবসার প্রথম দিকে তাঁকে নানা আর্থিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। এমন সময়ও এসেছিল যখন কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগে ছিলেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি।
এশিয়াজুড়ে বিস্তার কয়েক বছরের মধ্যেই AirTrunk অস্ট্রেলিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে জাপান, সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাজারে প্রবেশ করে। বিশ্ব যখন ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে শুরু করে, AirTrunk হয়ে ওঠে সেই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের ব্যবহৃত অনলাইন সেবা, ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড স্টোরেজ, ই-কমার্স এবং AI প্রযুক্তির পেছনে যে অবকাঠামো কাজ করছে, তার একটি বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত AirTrunk। ইতিহাস সৃষ্টি ২০২৪ সালে বিশ্ব ব্যবসা অঙ্গনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে AirTrunk। মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান Blackstone-এর নেতৃত্বে একটি কনসোর্টিয়াম AirTrunk-কে প্রায় ২৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারে অধিগ্রহণের চুক্তি সম্পন্ন করে। এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম প্রযুক্তি লেনদেন। এই চুক্তির পর রবিন খুদা আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের বিলিয়নিয়ার উদ্যোক্তাদের তালিকায় স্থান করে নেন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে যায়। প্রযুক্তির নতুন যুগ ও AirTrunk বর্তমান বিশ্বে AI-এর প্রসার ডাটা সেন্টারের চাহিদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ChatGPT, Google Gemini, Claude, Copilot-এর মতো প্রযুক্তিগুলো পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন। এই চাহিদা পূরণে AirTrunk-এর মতো কোম্পানিগুলো এখন বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকে ডাটা সেন্টার শিল্প হবে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। আর সেই বিপ্লবের অগ্রভাগে রয়েছেন একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা। সমাজসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যই নয়, রবিন খুদা সমাজসেবামূলক কাজের জন্যও প্রশংসিত। ২০২৫ সালে তিনি University of Sydney-কে ১০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার দান করেন।
এই অর্থ STEM (Science, Technology, Engineering and Mathematics) শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কাজে ব্যয় করা হবে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ অনুদান। তাঁর বিশ্বাস, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ গড়তে নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এক অনুপ্রেরণা বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য রবিন খুদার গল্প একটি অসাধারণ অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে বিশ্বমঞ্চে সফল হতে হলে জন্মস্থান নয়, প্রয়োজন স্বপ্ন দেখার সাহস, কঠোর পরিশ্রম এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব। ঢাকার একজন তরুণ থেকে অস্ট্রেলিয়ার বিলিয়নিয়ার উদ্যোক্তা—এই যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রতিভা ও অধ্যবসায়ের কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই।
আজ যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিরা শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নতুন নতুন সাফল্যের ইতিহাস রচনা করছেন, তখন রবিন খুদার নাম সেই গৌরবময় তালিকার এক উজ্জ্বল সংযোজন। তাঁর সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের সম্ভাবনারও এক গর্বিত প্রতীক। ঢাকার আকাশ থেকে সিডনির দিগন্ত, আর সেখান থেকে বিশ্ব প্রযুক্তির শীর্ষে—রবিন খুদার এই যাত্রা আগামী প্রজন্মের জন্য সাহস, স্বপ্ন ও সাফল্যের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।