আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ১৪ মে, ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম

নিউ ইয়র্ক শহরের লা গার্ডিয়া এয়ারপোর্ট ম্যারিয়ট হোটেলে ৩০ এপ্রিল থেকে ২ মে ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হলো ৯ম সিএমসি গ্লোবাল মিলনমেলা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের এই আন্তর্জাতিক পুনর্মিলনীতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অ্যালামনাইরা পরিবারসহ অংশগ্রহণ করেন। ৩০ এপ্রিল সকাল থেকেই প্রায় ১২০ জন সিএমসি অ্যালামনাই নিউইয়র্কে এসে একত্রিত হতে শুরু করেন। রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দীর্ঘদিন পর সহপাঠী, সিনিয়র ও জুনিয়রদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ, স্মৃতিচারণ এবং পারিবারিক মেলবন্ধনে পুরো হোটেল প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে। সন্ধ্যায় ডিনারের মাধ্যমে প্রথম দিনের মূল আয়োজন শুরু হয়।
ডিনারের পর অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল বিশেষ Manhattan বাস ট্যুর। রাত ৯টায় নিউ ইয়র্ক লা গার্ডিয়া এয়ারপোর্ট ম্যারিয়ট হোটেল থেকে বাস যাত্রা শুরু করে। প্রথম গন্তব্য ছিল লং আইল্যান্ড সিটির ‘The Greats of Craft–LIC Waterfront’, যেখানে ম্যানহাটনের স্কাইলাইন ও ইস্ট রিভারের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করেন সবাই। এরপর বাস যায় Brooklyn Heights Promenade, যেখান থেকে ঝলমলে ম্যানহাটন, ব্রুকলিন ব্রিজ এবং নদীর অপরূপ রাতের দৃশ্য দেখা যায়। পরবর্তী গন্তব্য ছিল ম্যানহাটনের Drumgoole Plaza. এরপর অংশগ্রহণকারীরা পৌঁছান Times Square-এর নিকটবর্তী ১৯৯ ড 45th Street এলাকায়। রাতের নিউইয়র্কের আলো, ব্যস্ততা ও নগরজীবনের প্রাণচাঞ্চল্য সবাইকে মুগ্ধ করে। গভীর রাতে বাসটি আবার লা গার্ডিয়া ম্যারিয়ট হোটেলে ফিরে আসে। পরদিন শুক্রবার, ১ মে, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় Continuing Medical Education বা CME সেশন। এই একাডেমিক পর্বে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট চিকিৎসকরা।
প্রফেসর এম. জি. আজম ‘Chronic Coronary Szndrome: What We Know? What We Need To Know?’ শীর্ষক প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। ডা. এম. ডি. মহিউদ্দিন ‘Cancer Care in Bangladesh: Current Situation’ বিষয়ে বাংলাদেশের ক্যান্সার চিকিৎসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন। প্রফেসর এম এ ফয়েজ ‘Clinical Challenges in Early Malaria Diagnosis and Treatment’ নিয়ে আলোচনা করেন। ডা. নওরীন হক ‘Spicing Up Cardiovascular Risk Assessment: A Guide to South Asian Heart Health’ বিষয়ক বক্তব্য দেন। ডা. আবু এম. ইয়াকুব ‘Metastatic Rectal Neuroendocrine Tumor in Advanced Age: An Overview উপস্থাপন করেন। সবশেষে ডা. তানজিব হোসাইন ‘Critical Care Proactive Rounding in the Hospital and Impact on the Patient Care’ নিয়ে আলোচনা করেন। প্রতিটি সেশনের পর প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। সিএমই সেশনের পাশাপাশি পোস্টার প্রেজেন্টেশনও অনুষ্ঠিত হয়। এতে নবিহা আতিকুজ্জামান, নামিরা হোসেন, ডা. আকেসন গ্রাহাম, ডা. মোহাম্মদ খোরশেদ মজুমদার, ডা. চার্লস পেং, ডা. স্টেফানে জি, ডা. কেভিন চেনসহ বিভিন্ন তরুণ চিকিৎসক ও গবেষক তাদের গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল কেস উপস্থাপন করেন।
পোস্টার প্রেজেন্টেশন একাডেমিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করে এবং তরুণপ্রজন্মের গবেষণামুখী অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে। শুক্রবারের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল বই প্রকাশনা উৎসব। সিএমসি ৩৮তম ব্যাচের ডা. নুরুন নাহার ডেইজি, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পেরেলম্যান স্কুল অব মেডিসিনে ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রির সহযোগী অধ্যাপক, তার লেখা বই Since the Pandemic: A Guide to Mental Wellbeing in a Changed World আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেন। পরিবর্তিত বিশ্বে মানসিক সুস্থতা, সহনশীলতা, আশাবাদ ও আত্মিক পুনর্গঠনের বাস্তবধর্মী দিকনির্দেশনা নিয়ে লেখা বইটি উপস্থিত অ্যালামনাইদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি করে। এই মিলন মেলায় আরেকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আয়োজন ছিল সিএমসির প্রখ্যাত ও প্রতিভাবান লেখকদের বই প্রদর্শনী এবং চ্যারিটি সেল।
অনুষ্ঠানের একটি নির্দিষ্ট অংশজুড়ে সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছিল এই বইমেলা, যেখানে অংশগ্রহণকারী অতিথিরা এক নজরে দেখতে পেরেছেন সিএমসিয়ানদের সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্য ও গভীরতা। প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে প্রফেসর এম এ ফয়েজ, ডা. ফারুক আজম, প্রফেসর প্রণব কুমার চৌধুরী, ডা. মাহমুদ এ চৌধুরী অরজু, ডা. হামিদ হোসেন খুররম, ডা. শাহাদুজ্জামান, ডা. মোহাম্মদ শওকত রাজ্জাক, ডা. আহমেদ শরীফ শুভ, ডা. জিল্লুর রহমান, ডা. তিতাস মাহমুদ, ডা. বি এম আতিকুজ্জামান, ডা. মোস্তাক আহমেদ, ডা. ভাগ্যধন বড়ুয়া, প্রফেসর এম.জি. আজম, ডা. ইব্রাহিম মোহাম্মদ ইকবাল, ডা. সাজেদুল হক, ডা. ফারিদা ইয়াসমিন শুমি, ডা. নুরুন নেসা বেগম ডেইজি এবং ডা. মাহবুব ময়ূখ রিশাদের মতো গুণী লেখকদের বই। এই আয়োজন শুধু একটি প্রদর্শনী ছিল না; এটি ছিল জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা এবং মানবিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন।
চ্যারিটি সেলের মাধ্যমে বই বিক্রির একটি অংশ দান করা হয় মানবকল্যাণমূলক কাজে, যা এই উদ্যোগকে আরও অর্থবহ করে তোলে। উপস্থিত অতিথিরা বই কিনে যেমন নিজেদের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি সমাজসেবামূলক উদ্যোগেও অংশ নিয়েছেন। এই বই প্রদর্শনী ও চ্যারিটি সেল পুরো মিলন মেলাকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা- যেখানে চিকিৎসকরা শুধু চিকিৎসাবিদ্যায় নয়, সাহিত্য ও সমাজকল্যাণেও তাদের গভীর সম্পৃক্ততার পরিচয় তুলে ধরেছেন। এই বৃহৎ আয়োজন সফল করতে স্পন্সর ও দাতাদের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্র্যান্ড স্পন্সর হিসেবে ছিলেন ডা. আবু কুতুবউদ্দিন ও ডা. শাহীন মুস্তাফা, ডা. মোহাম্মদ মোমিনুল হক, ডা. শাইখ হাসান, ডা. আশরাফুল হক নিন্টু ও ডা. সামিয়া সাবীন শুক্তি এবং ঘঅঐঅজ-এর পক্ষে ডা. আতাউল ওসমানী। প্লাটিনাম স্পন্সর ছিলেন ডা. শামস আবদুস শাকিল ও ডা. নিজাম মিয়া। গোল্ড স্পন্সর হিসেবে ছিলেন ডা. মাকসুদ চৌধুরী ও ডা. শামীম বেগম, ডা. শাহ আলম চৌধুরী, ডা. এ টি এম ইউসুফ স্বপন, ডা. সেলিম হোসেন, ডা. ইমতিয়াজ চৌধুরী, ডা. জাহির সারোয়ার, ডা. রুমি আহমেদ, ডা. মোহাম্মদ খোরশেদ মজুমদার, ডা. মোস্তাক চৌধুরী এবং ডা. আহমাদ মোর্শেদ। Mug with Logo Sponsor ছিলেন ডা. নুর মোহাম্মদ।
বিশেষ অনুদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয় ডা. মনোয়ারা বেগম, ডা. ফজলুল ইউসুফ এবং ডা. মেসকাথ উদ্দিনকে। ডা. বাশার এম আতীকুজ্জামান-এর সম্পাদনায় ‘বন্ধু কি খবর বল?’শিরোনামে একটি স্মরণিকা প্রকাশ এই মিলনমেলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। স্মরণিকাটি শুধু একটি প্রকাশনা নয়, বরং এটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতি, বন্ধুত্ব, পেশাগত যাত্রা এবং আবেগের এক অনন্য সংকলন। এই প্রকাশনার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাচের অ্যালামনাইদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্মৃতিচারণ, সাফল্যের গল্প এবং মেডিকেল শিক্ষার রিফর্ম এর কথা উঠে এসেছে। ‘বন্ধু কি খবর বল?’ নামটিই যেন এক আবেগঘন আহ্বান- পুরনো বন্ধুদের খোঁজ নেওয়া, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলোকে আবার জাগিয়ে তোলা এবং সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে একে অপরের সাথে সংযুক্ত হওয়ার একটি সেতুবন্ধন। পাবলিকেশন কমিটির সদস্যরা এই স্মরণিকাটি প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কমিটিতে ছিলেন ডা. মোশতাক চৌধুরী, ডা. শাহরিয়ার মুরশেদ (সানি), ডা. সায়েদা নাসরিন আলম এবং ডা. নুপুর কান্তি দাস। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, পরিকল্পনা এবং সম্পাদনা দক্ষতার ফলেই স্মরণিকাটি একটি সুসংগঠিত ও মানসম্মত রূপ পেয়েছে। তারা বিভিন্ন লেখকের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ, সম্পাদনা, বিন্যাস, প্রুফরিডিং এবং চূড়ান্ত প্রকাশনার প্রতিটি ধাপে নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন। ফলে স্মরণিকাটি শুধু তথ্যসমৃদ্ধই নয়, নান্দনিক উপস্থাপনাতেও হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয়।
এই উদ্যোগটি মিলনমেলার সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিককে সমৃদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি মূল্যবান দলিল হিসেবে থেকে যাবে- যেখানে সংরক্ষিত থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্মের বন্ধুত্ব, স্মৃতি এবং ঐতিহ্যের গল্প। শুক্রবার সন্ধ্যায় সিএমসি পরিবারের সবার প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক পর্ব- ‘ফ্যামিলি নাইট’। এই আয়োজনটি ছিল গান, গুচ্ছ কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য এবং স্মৃতিচারণের সমন্বয়ে সাজানো এক বর্ণিল প্যাকেজ, যেখানে ছোট-বড় সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল আনন্দ, উচ্ছ্বাস এবং আন্তরিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন, যা সবার মনে তৈরি করে এক উষ্ণ পারিবারিক আবহ। পরিবার-পরিজন নিয়ে উপস্থিত অতিথিরা এই আয়োজনটি উপভোগ করেন অত্যন্ত আনন্দের সাথে। কেউ মঞ্চে পরিবেশন করেছেন প্রিয় গান, কেউ আবৃত্তি করেছেন হৃদয়ছোঁয়া কবিতা, আবার কেউ নৃত্যের মাধ্যমে মুগ্ধ করেছেন দর্শকদের। প্রতিটি পরিবেশনা ছিল আন্তরিকতা ও আবেগে ভরপুর, যা উপস্থিত সবাইকে একসূত্রে বেঁধে রাখে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল কানাডা থেকে আগত সাফওয়াত মহিউদ্দিনের কণ্ঠে পরিবেশিত জনপ্রিয় গান ‘আমায় ডেকোনা ফেরানো যাবে না’। তার আবেগঘন পরিবেশনায় মুহূর্তেই সৃষ্টি হয় এক নস্টালজিক পরিবেশ, যেখানে অনেকেই গানের সাথে গলা মিলিয়ে নেন। উপস্থিত দর্শকরা গানটি গভীরভাবে উপভোগ করেন এবং করতালির মাধ্যমে শিল্পীকে সম্মান জানান।
‘ফ্যামিলি নাইট’ ছিল শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ছিল সিএমসি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বন্ধন আরও দৃঢ় করার এক সুন্দর উপলক্ষ- যেখানে স্মৃতি, ভালোবাসা এবং আনন্দ একসাথে মিলেমিশে এক অবিস্মরণীয় সন্ধ্যার জন্ম দেয়। শনিবার সকালের নাস্তার পর সবাই বাসে করে রওনা হন জরাবৎ ঈৎঁরংব-এর উদ্দেশ্যে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে আগে থেকেই জানানো হয়, সকাল ৮টা থেকে হোটেল লবি থেকে বাস ছাড়বে, ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে সবাইকে মেরিনায় পৌঁছাতে হবে, ৯টা ৩০ মিনিটে বোর্ডিং শুরু হবে এবং সকাল ১০টায় জাহাজ ডক ছেড়ে যাবে। সময়ানুবর্তিতা বজায় রেখে সবাই নির্ধারিত সময়ে মেরিনায় পৌঁছান। জরাবৎ ঈৎঁরংব-এ সারাদিন ছিল সংগীত, আড্ডা, নাচ, খাবার ও আনন্দের মিলিত পরিবেশ। ‘মাটি’ ব্যান্ডের সঙ্গে সংগীত পরিবেশন করেন ক্লোজ-আপ তারকা রন্টি দাশ। বাংলা গান, লোকসংগীত ও জনপ্রিয় সুরে পুরো ক্রুজ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
সংগীতের তালে তালে পরিবেশন করা হয় ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রামের মেজবানী খাবারÑমেজবানী মাংস, রুই মাছের পেটি, ডাল ও সাদা ভাত। মিষ্টান্ন হিসেবে ছিল রসগোল্লা ও কালোজাম। পুরো পরিবেশনা ও সমন্বয়ে ছিলেন সেলিম হোসেন ভাই, যার দক্ষ পরিচালনায় দিনের আয়োজনটি প্রাণবন্ত ও স্মরণীয় হয়ে ওঠে। সিএমসির এই গ্লোবাল রিইউনিয়ন এর শেষ দিন দুইজন কীর্তিমান সিএমসিয়ান কে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। উনারা হলেন সিএমসি ১৫ তম ব্যাচের ডা. প্রফেসর এম এ ফয়েজ। নবম ত্রিবার্ষিক গ্লোবাল রিইউনিয়ন উপলক্ষে CMC Alumni of USA প্রফেসর (ডা.) মোহাম্মদ আবুল ফয়েজ (CMC 15)-কে একজন অনন্য ক্লিনিক্যাল শিক্ষাবিদ ও গবেষক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। বাংলাদেশের চিকিৎসাশিক্ষায় তার অবদান অতুলনীয়। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার মহাপরিচালক (Director General) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রফেসর ফয়েজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো সাপের কামড় নিয়ে গবেষণা এবং বাংলাদেশে সাপের কামড়ে মৃত্যুহার কমানোর নিরলস প্রচেষ্টা। তিনি সাপের কামড় বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করেন, হাজার হাজার চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দেন এবং গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত অ্যান্টিভেনম পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তিনি বাংলাদেশ সাপের কামড় নির্দেশিকা এবং WHO-এর গ্লোবাল স্নেকবাইট গাইডলাইনের প্রণেতা। অন্যদিকে, Distinguished Service to the Society স্বীকৃতি পান ডা. শামস আব্দুস শাকিল (CMC 19th Batch, 1982), যিনি বাংলা ফোনেটিক QWERTY কিবোর্ডের পথিকৃৎ এবং ডিজিটাল বাংলার এক নীরব স্থপতি হিসেবে পরিচিত। তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বাংলা ভাষাকে ডিজিটাল মাধ্যমে লেখার ধরণকে আমূল পরিবর্তন করেছে। ৯ম CMC গ্লোবাল রিইউনিয়নের শেষদিনে গালা ডিনারের পূর্বে প্রফেসর ফয়েজ এবং ডা. শাকিল- এই দুই গুণী ব্যক্তিত্বকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়, যা পুরো অনুষ্ঠানে এক গৌরবময় ও আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি করে। গালা ডিনারের পর শুরু হয়েছিল সামিনা চৌধুরীর সুরের মূর্ছনায়, আর সেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়েই শেষ হলো আমাদের এই মিলন মেলা।
আনন্দ, স্মৃতি আর বন্ধনের উষ্ণতায় ভরা এই আয়োজন আমাদের হৃদয়ে রয়ে যাবে অনেকদিন। ডিনারের পর আয়োজনের এক আবেগঘন ও আনন্দময় পরিসমাপ্তি ঘটে একটি বিশাল আকৃতির কেক কাটার মধ্য দিয়ে। সুসজ্জিত সেই কেকটি যেন পুরো মিলনমেলারই প্রতিচ্ছবি- চারপাশে তাজা ফলের বর্ণিল অলংকরণ, আর মাঝখানে লাল অক্ষরে লেখা ‘Ô9th CMC Alumni Reunion 2026’- যা এই মহামিলনের স্মৃতিকে স্থায়ীভাবে ধারণ করে রাখার এক অনন্য নিদর্শন। কেক কাটার সেই মুহূর্তে উপস্থিত সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস, করতালি আর স্মৃতিমাখা আবেগের এক অনবদ্য মেলবন্ধন। যেন এই একটি ক্ষণেই বিগত কয়েক দিনের সব আনন্দ, আড্ডা, সংগীত, গল্প আর পুনর্মিলনের আবেগ একসূত্রে গাঁথা হয়ে উঠেছিল। কেউ ব্যস্ত ছিলেন মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করতে, কেউ ভিডিও ধারণে, আবার কেউ নিঃশব্দে অনুভব করছিলেন এই বিশেষ সময়ের গভীরতাÑযা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন, কিন্তু হৃদয়ে থেকে যায় চিরকাল। দুই পরতের নরম স্পঞ্জ কেক যেমন সহজেই মুখে মিলিয়ে যায়, তেমনি অতি দ্রুত কেটে গেল এই কয়েকটি রঙিন দিন।
মনে হচ্ছিল, এই মিলনমেলা যেন মাত্র শুরু হয়েছিলÑকিন্তু সময়ের নিজস্ব নিয়মে তারও সমাপ্তি এল। কেকের প্রতিটি টুকরো যেন হয়ে উঠেছিল এক একটি স্মৃতির অংশ, যা সবার মাঝে সমানভাবে বিলিয়ে গেল। শেষে এক ধরনের নীরব আবেগ আর তৃপ্তির অনুভূতি নিয়ে সবাই ফিরে গেলেন যার যার গন্তব্যেÑকেউ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে, কেউবা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। কিন্তু দূরত্ব যতই বাড়ুক, এই মিলনমেলার স্মৃতি, বন্ধুত্বের উষ্ণতা এবং একসাথে কাটানো সময়ের আনন্দ সবার হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে। এইভাবেই ‘৯ম সিএমসি অ্যালামনাই গ্লোবাল রিইউনিয়ন ২০২৬’ তার বর্ণিল, সুশৃঙ্খল ও হৃদয়ছোঁয়া আয়োজনের পরিসমাপ্তি ঘটায়Ñএকটি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রেখে যায় যে, আবারও কোনো একদিন, কোনো এক স্থানে, সকল সিএমসিয়ান একই বন্ধনের টানে একত্রিত হবেন, নতুন গল্প, নতুন স্মৃতি আর পুরনো সম্পর্কের নবায়নে। আমরা সবাই আবার দেখা করার আশায় রইলাম পরবর্তী মিলনমেলা মায়ামী বিচে। সবার প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
৯ম সিএমসি গ্লোবাল মিলনমেলা শুধু একটি পুনর্মিলনী নয়; এটি ছিল সিএমসি পরিবারের বৈশ্বিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার এক মহৎ উদ্যোগ। এখানে পেশাগত নেটওয়ার্কিং, একাডেমিক অভিজ্ঞতা বিনিময়, সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা এবং পারিবারিক সম্প্রীতির এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। নিউইয়র্কের প্রাণকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এই কয়েক দিনের আয়োজন প্রাক্তন সিএমসিয়ানদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন ধরে অমলিন স্মৃতি হয়ে থাকবে। সবশেষে, এই সফল আয়োজনের পেছনে যারা নিরলস পরিশ্রম করেছেন, সেই আয়োজক কমিটির প্রতি জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা। বিশেষ করে ডা. মমিনুল হকের নেতৃত্বে তাঁর টিমÑখোরশেদ মজুমদার, সেলিম হোসেন, আহমদ মোরশেদ, মোহাম্মদ সায়েম, নুরুন বেগম ডেইজি, শ্রাবন্তী সাহা অভি, শেখ হাসান, শেখ জাহেদসহ সকলের অক্লান্ত পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই এই মিলনমেলা এত সুন্দর ও স্মরণীয় হয়ে উঠেছে। তাদের এই নিষ্ঠা ও সংগঠনী দক্ষতা নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের আয়োজনগুলোর জন্য এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রুান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা