আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ০৭ মার্চ, ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম

নন্দিনী লুইজা
বিশ্ব বাজারে পিছিয়ে বাংলাদেশ: তরুণদের বিজ্ঞান প্রীতি ফেরানোর কৌশল বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বায়নের যুগে প্রবেশ করেছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অগ্রগতি নির্ভর করছে কতটা শিক্ষিত, সৃজনশীল ও প্রযুক্তি নিপুণ প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারছে তার উপর। বর্তমানে বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো বিজ্ঞান শিক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে তরুণদের মধ্যে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি প্রবল আকর্ষণ রয়েছে। সেখানে প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে পরীক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তি-নির্ভর শিক্ষা লাভ করে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়ার স্কুলগুলোতে বিজ্ঞান ল্যাবরেটরি ও রোবোটিক্স ক্লাব বাধ্যতামূলক, যা শিক্ষার্থীদের কৌতূহল এবং উদ্ভাবনী শক্তি বাড়াতে সহায়তা করে। একইভাবে ফিনল্যান্ডে ছোটবেলা থেকেই প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা চালু আছে, যেখানে বিজ্ঞানের ব্যবহারিক জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ফলে এসব দেশের তরুণরা শুধু তত্ত্ব নয়, প্রয়োগেও দক্ষ হয়ে উঠছে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে।
সেখানে বাংলাদেশে শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি যথেষ্ট উৎসাহী নয়। অনেক স্কুল ও কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি নেই, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। হাতে-কলমে পরীক্ষা করার সুযোগ সীমিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান ভীতি এবং অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী কেবল পরীক্ষার জন্য মুখস্থ বিদ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে। ২০২৪ সালের এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক স্তরের মাত্র প্রায় ৩৫% শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হচ্ছে, যেখানে ভারত বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোতে এ হার ৫০-৬০%। এ থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশে তরুণদের বিজ্ঞানমুখিতা কমছে, যা ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।এর পেছনে প্রধান কারণ শুধু মনস্তাত্ত্বিক নয়, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত ঘাটতিও বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, আর শিক্ষকেরাও যথাযথভাবে শিক্ষাদানে ব্যর্থ হচ্ছেন। এটি সরাসরি প্রভাব ফেলে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতির ধীরগতি এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে দেশকে পিছিয়ে রাখে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানবোধ ও প্রযুক্তি-উদ্যোগী মনোভাব গড়ে তোলার জন্য প্রথমে প্রয়োজন প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতি সংস্কার। শুধু তত্ত্বভিত্তিক শিক্ষা নয়, ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে পরীক্ষামূলক সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রিত করে ল্যাবরেটরি উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা সম্ভব। এখানে সরকারি অনুদান এবং শিল্পপতিদের অর্থায়ন একত্রে কাজ করলে প্রাপ্ত সংস্থান দিয়ে আধুনিক ল্যাব স্থাপন করা সম্ভব। শিক্ষক প্রশিক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষক নিজে ব্যবহারিক কাজ শেখেননি, ফলে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষকরা যেন নতুন প্রযুক্তি ও প্রয়োগমূলক শিক্ষায় দক্ষ হন, এজন্য বছরে অন্তত একবার রিফ্রেশার কোর্স, ওয়ার্কশপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষকের উদ্ভাবনী ধারণা এবং শিক্ষার্থীকে প্রকল্পভিত্তিক কাজের সুযোগ প্রদান, বিজ্ঞান শিক্ষাকে কেবল বই-পড়া বা পরীক্ষার বিষয় হিসেবে না রেখে জীবনের প্রয়োগযোগ্য জ্ঞানে রূপান্তরিত করতে সহায়তা করবে।
ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিজ্ঞানবোধ বাড়াতে ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীল উদ্দীপনা জাগানো জরুরি। বিজ্ঞান মেলা, রোবোটিক্স ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা, DIY প্রকল্প, ছোট ছোট এক্সপেরিমেন্ট, গ্রাম-গঞ্জে মোবাইল সায়েন্স ভ্যান—এগুলো শিক্ষার্থীদের কৌতূহল জাগাতে এবং তাদের হাতে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে কার্যকর। পাশাপাশি ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যেতে পারে। বিনামূল্যে অনলাইন কোর্স, ভিডিও টিউটোরিয়াল এবং ওপেন সোর্স শিক্ষণ সামগ্রী শিক্ষার্থীদের সহজে পৌঁছাতে পারে। স্থানীয় ভাষায় এই শিক্ষা উপাদান তৈরি ও ছড়িয়ে দিলে বিজ্ঞান শেখা আরও আকর্ষণীয় হবে। তরুণদের অনাগ্রহের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, অবকাঠামোগত ঘাটতি। আধুনিক ল্যাব, পরীক্ষাগার ও পর্যাপ্ত বিজ্ঞান শিক্ষক নেই। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকের প্রশিক্ষণ অভাব। অনেক শিক্ষকই নতুন প্রযুক্তি বা ব্যবহারিক শিক্ষা পদ্ধতিতে দক্ষ নন। তৃতীয়ত, সামাজিক মানসিকতা ও ক্যারিয়ার ভীতি। এখনো অনেক পরিবার মনে করে বিজ্ঞান পড়লে চাকরির সুযোগ কম বা পড়াশোনা কঠিন।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:- আধুনিক ল্যাবরেটরি ও সরঞ্জাম উন্নয়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রতিটি স্কুলে আধুনিক বিজ্ঞান ল্যাব স্থাপন করা উচিত। দক্ষিণ কোরিয়ার মডেল অনুসরণ করে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক বিজ্ঞান ক্লাব চালু করা যেতে পারে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যৌথ কর্মশালা, অনলাইন রিফ্রেশার কোর্সের ব্যবস্থা করতে হবে। ফিনল্যান্ডের মতো দেশে যেখানে শিক্ষকরা বছরে একাধিক প্রশিক্ষণ নেন, বাংলাদেশেও তেমন ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা ও বিজ্ঞান মেলা ছোটবেলা থেকেই অংশগ্রহণে রোবোটিক্স প্রতিযোগিতা, অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট প্রতিযোগিতা চালু করা প্রয়োজন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বইয়ের বাইরের জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত হবে। ডিজিটাল শিক্ষা প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার করে অনলাইন কোর্স, ভার্চুয়াল ল্যাব এবং ওপেন সোর্স লার্নিং টুলকে জনপ্রিয় করতে হবে। ভারতে "আতল টিংকারিং ল্যাব" উদ্যোগের মতো বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা যেতে পারে।
ক্যারিয়ার গাইডেন্স ও পিতামাতার ভূমিকার ফলে পরিবারকে বোঝাতে হবে যে বিজ্ঞান শিক্ষা শুধু চাকরির পথ নয়, উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনের সুযোগও তৈরি করে। পিতামাতা ও শিক্ষকরা মিলে শিশুদের মধ্যে বিজ্ঞানভীতি দূর করতে কাজ করতে হবে। বিজ্ঞান-ভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী দিকেও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। যদিও ল্যাব অভাবে সরাসরি ব্যবহারিক বিজ্ঞান শিক্ষা সীমিত, শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির মাধ্যমে আগ্রহী হতে পারে। বিশেষভাবে নিম্নলিখিত ক্ষেত্র গুলোতে দক্ষতা অর্জন করানো যেতে পারে:- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT): কোডিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা সায়েন্স এবং সাইবার সিকিউরিটি। স্মার্ট ও গ্রিন টেকনোলজি: সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি। কৃষি প্রযুক্তি: হাইড্রোপনিক চাষ, ড্রোনের মাধ্যমে ফসল পর্যবেক্ষণ, স্মার্ট ফার্মিং। হেলথ টেক: বায়োমেডিক্যাল যন্ত্র, টেলিমেডিসিন, মেডিকেল রোবোটিক্স। টেকনিক্যাল ভোকেশনাল শিক্ষা: মেকাট্রনিক্স, ইলেকট্রনিক্স মেরামত, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন।
এছাড়াও, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। জার্মানির "ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম" অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও গবেষণামূলক কাজের সুযোগ দিলে তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। বাংলাদেশের তরুণদের বিজ্ঞানবিমুখতা কাটিয়ে উঠতে হলে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং শিল্পখাতকে একযোগে কাজ করতে হবে। আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক, ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক মানের উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে তরুণ প্রজন্ম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে সক্ষম হবে। ফলে বাংলাদেশও দক্ষিণ কোরিয়া বা ফিনল্যান্ডের মতো উন্নত দেশের কাতারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। পরিশেষে বিজ্ঞান শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষার বিষয় হিসেবে না দেখে জীবনের প্রয়োগযোগ্য শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হলে তরুণ প্রজন্ম নিজেই দেশের অগ্রগতির চালিকাশক্তি হবে। বাংলাদেশের তরুণদের বিজ্ঞানবিমুখতা কাটিয়ে ওঠা কেবল একটি শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ নয়, এটি জাতির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের নির্ণায়ক শর্ত। আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক, ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক মানের উদ্ভাবনী উদ্যোগের সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের তরুণরাই আগামী দিনের বিশ্বমঞ্চে নতুন উদ্ভাবনের পথিকৃৎ হতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া বা ফিনল্যান্ডের মতো দেশকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বাংলাদেশও অদূর ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও গবেষণার নেতৃত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। এ লক্ষ্যেই এখনই দরকার বিজ্ঞান শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে উন্নীত করে তরুণদের জন্য এক অনুপ্রেরণামূলক, সম্ভাবনাময় পথ তৈরি করা।