আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ০৭ মার্চ, ২০২৬, ১২:৪২ পিএম

সুমন রহমান
খবর পড়ছি ইমরুল চৌধুরী বাংলাদেশে তখন সম্প্রচার মাধ্যম ছিল মাত্র দুটি- রেডিও বাংলাদেশ/বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন। রেডিও টিভির সংবাদ পাঠকদের তখন তারকা-খ্যাতি; টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত শ্রোতারা তাদের নাম জানেন। সে সময়ের সেই বিখ্যাত সংবাদ পাঠকদের অন্যতম ছিলেন ইমরুল চৌধুরী। ইমরুল চৌধুরীর খবর পড়ার জীবন কখন কিভাবে শুরু আমার জানা নেই। আমি তাকে দেখেছি ১৯৭৯ সাল থেকে। ওই বছর আমি রেডিও বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় বার্তা সংস্থায় অনুবাদক হিসেবে যোগ দিই। বেতার ভবন তখন শাহবাগে। ১৯৯৫ সালে রেডিও জাপানের বাংলা সার্ভিসে যোগ দিয়ে টোকিও চলে যাই। সেই থেকে আমি দেশান্তরী।
ইমরুল চৌধুরী কোন সালে রেডিওর সংবাদ পাঠ থেকে অবসর নেন জানি না। অনেক দিন আগে অবসর নিয়ে থাকলে এ যুগের মানুষের কাছে হয়তো তিনি তেমন পরিচিত নন। দীর্ঘ ১৭ বছর কেন্দ্রীয় বার্তা সংস্থায় একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে অনেক অনুবাদক, সংবাদ পাঠক, সম্পাদকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আড্ডা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে, ইমরুল চৌধুরীর সঙ্গে তেমনটি হয়নি। তিনি মানুষ হিসেবে খুব গম্ভীর না হলেও স্বল্পবাক ছিলেন। খবর শেষ হওয়ার পর বা দুই খবরের মধ্যবর্তী বিরতির সময় রেডিওর ক্যান্টিনে আমাদের আড্ডা জমে উঠতো। তিনি সেইসব আড্ডায় শামিল হয়েছেন এমনটা মনে পড়ে না। হয়তো তার আড্ডার মানুষ ও মেজাজ ছিল ভিন্ন।
ইমরুল চৌধুরী বেতার সম্প্রচার ছাড়াও বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন জগতের একজন সফল মানুষ ছিলেন। এ্যাডকিং নামের একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার কর্ণধার ছিলেন তিনি। সে সময় এ্যাডকিং ছিল বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বিজ্ঞাপন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। আমি রেডিওতে খবর অনুবাদের পাশাপাশি অন্য একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কপিরাইটার হিসেবে কাজ করতাম। সেই বিজ্ঞাপন সংস্থার আর্টিস্টদের কেউ কেউ এ্যাডকিংয়ে যোগ দেন। কখনও সেগুনবাগিচার দিকে গেলে সেই আর্টিস্ট বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি এ্যাডকিংয়ে ঢুঁ মারতাম। ইমরুল চৌধুরী দেখতে পেলে চা খেতে বলতেন। টিভি নাটকের অভিনেত্রী লুৎফুন্নাহার লতাকে তখন এ্যাডকিংয়ে কাজ করতে দেখেছি। ইমরুল চৌধুরী লেখালেখি করতেন। কিন্তু, নিজের লেখা সম্পর্কে তার মুখ থেকে কখনও কিছু শুনিনি। লেখালেখির ক্ষেত্রে সম্ভবত সেটা ছিল তার খরার কাল।
তাঁর জীবনের এই দিকটির ওপর আলোকপাত করতে তাঁর একটি বইয়ের ব্লার্বের আশ্রয় নিতে হচ্ছেঃ লেখালেখির কাজটা শুরু হয়েছিল কিশোর বয়সের ছাত্র অবস্থা থেকেই। প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিল আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী সম্পাদিত মিল্লাত পত্রিকার ‘কিশোর দুনিয়ায়’ ১৯৫৬ সালে। পিতৃ প্রদত্ত নাম মেসবাহ উদ্দিন চৌধুরী নামে আত্মপ্রকাশ করলেও পরবর্তী পর্যায়ে ইমরুল ইসলাম চৌধুরী এবং ক্রমান্বয়ে ইমরুল চৌধুরী নামে পরিচিত হন। খেলাঘর এবং তৎকালীন মুকুলের মহফিল-এ বিশিষ্ট শিশু সাহিত্যিক কবি হাবীবুর রহমানের স্নেহশীল স্পর্শে এসে তখন দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি করেন। ছড়া, গল্প, কবিতা ইত্যাদি। একসময় ষাট-এর দশকে এদেশের প্রধান সারির কবি হিসেবেও খ্যাতি লাভ করেন। তখনকার সাড়া জাগানো কবিতা পত্রিকা ‘স্বাক্ষর’ এর প্রথম সম্পাদকও তিনি। কৈশোরে কবি হবার বাসনায় কলকাতা পালিয়ে গেলেও উত্তর কালে লেখার সঙ্গে সংশ্রব বলা যায় ছিলই না।’
ইমরুল চৌধুরীর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছেঃ ভূতের সঙ্গে ষাট সেকেন্ড, ছাগল নিয়ে ছাগলামি, ইমু মিয়ার প্রত্যাবর্তন, ইমু মিয়ার বিবর্তন এবং অন্ধকার ব্যতিরেকে। ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় ইমরুল চৌধুরীর ইমু সমগ্র। এতে একান্ত কিছু কথায় তিনি লিখেছেনঃ ৬০-এর দশকের শুরুতে আমার প্রথম শিশুতোষ গ্রন্থ ‘ভূতের সাথে ষাট সেকেন্ড’ প্রকাশিত হয়েছিল। ঐ গ্রন্থে খ্যাতিমান কথা সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ছোট্ট একটি ভূমিকা লিখেছিলেন। ভূমিকাটি নিম্নরূপ - ‘তরুণ লেখক ইমরুল চৌধুরীর ছোটদের জন্য লেখা কয়েকটি হাসির গল্প পড়লাম। লেখক এখনো ছাত্র, তাই কিশোর মনের সঙ্গে তার গল্প বলার ধরনটি ভালো, ছোটদের খুশি করবার আর্ট তিনি জানেন। কয়েকটি গল্পের বাঁধুনিও চমৎকার। ভবিষ্যৎ জীবনে তিনি কৃতী লেখক হবার প্রতিশ্রুতি এনেছেন।’ ইমরুল চৌধুরী লিখেছেনঃ জীবনের তাগিদে মিডিয়ার জগতে প্রবেশ করে লেখকসত্তা প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলাম। কে যেন এই জগতে আমাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এলো দীর্ঘ ৪০ বছর পর।’ বেতার সম্প্রচার জগতের খ্যাতিমান সংবাদ পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপন ব্যক্তিত্ব ইমরুল চৌধুরী গত ১০ আগস্ট মারা গেলেন। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই।