হাওর থেকে বিশ্বমঞ্চে সুরের সাধক পণ্ডিত রামকানাই দাশ

Akbar H Kiron
By Akbar H Kiron আগস্ট ২০, ২০১৭ ০২:৫৪

হাওর থেকে বিশ্বমঞ্চে সুরের সাধক পণ্ডিত রামকানাই দাশ

মনিজা রহমান 

হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের এক অনন্য জনপদ। দেশের অন্যান্য এলাকার সঙ্গে এখানকার সমাজ-সংস্কৃতি একেবারে মেলে না। শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমে এখানকার দৃশ্য দুই রকম। এখানকার মানুষ শিশু অবস্থায় শিখে যায় সাঁতার কাটতে আর গান গাইতে। কালে ভদ্রে এলাকার কেউ কেউ নিজের অঞ্চল ছাড়িয়ে ছড়িয়ে যান পুরো দেশে, এমনকি পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে। যেমন পেরেছেন রামকানাই দাশ। দারিদ্র্যের কারণে তাঁর পড়াশোনা হয়নি। তিনি শিখেছেন জীবনের পাঠশালা থেকে। তাঁর গড়া সংগীত পরিষদ শুধু রামকানাই দাশের এলাকায় নয়, এখান এই নিউইয়র্ক শহরে বাংলা সংগীত-সংস্কৃতির বিরাট পীঠস্থান।

রামকানাই দাশের জন্ম সুনামগঞ্জে, ১৯৩৫ সালের ১৫ এপ্রিল। পৃথিবী ছেড়ে চলে যান ২০১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। পুরো জীবনটাই তিনি সঁপে দিয়েছিলেন সংগীতের সাধনায়। বংশানুক্রমে তিনি ছিলেন সুরের সাধক। যে ধারা বহন করে চলেছেন তাঁর সুযোগ্য কন্যা কাবেরী দাশ এবং দৌহিত্রী পারমিতা দাশ ও শ্রুতিকণা দাশ। রামকানাই দাশ প্রাচীন গানগুলো সরাসরি তাঁর পূর্ব প্রজন্মের কাছ থেকে সুর সমেত সংগ্রহ করে একইভাবে গেয়েছিলেন। এ জন্যই তাঁর কণ্ঠ মাটিঘেঁষা, এ জন্যই তাঁর কণ্ঠ আদি ও অকৃত্রিম। প্রাচীন গানের সুর ও কথার কোনো অদলবদল তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তিনি নিজে তো করেননি, কাউকে করতে দেখলে দুঃখ-ক্ষোভ প্রকাশ করতেন। রামকানাই প্রাচীন লোকগানের একটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেছিলেন। গানের অকৃত্রিমতা যাতে নষ্ট না হয়—সে জন্য তিনি এসব গানের স্বরলিপিও তৈরি করেছিলেন। প্রাচীন লোকগানের আদলে নিজেও অনেক গান রচনা করেছেন। তাই রামকানাই দাশের কাছে বাংলা লোকগীতির কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

পন্ডিত রামকানাই দাশকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন সাংবাদিক কৌশিক আহমেদ

খুব ছোট বয়সে বাবার হাত ধরে তবলায় চাঁটি মেরে যাত্রাগানের আখড়ায় রামকানাই দাশ সংগীত জীবনে প্রবেশ করেছিলেন। এরপর উচ্চাঙ্গসংগীতে পারদর্শিতা অর্জন করলেও পরিণত বয়সে রবীন্দ্র সংগীতের সুদক্ষ প্রশিক্ষক হয়ে ওঠেন। কিন্তু শেষ বয়সে লোকসংগীতের সিডি প্রকাশ করে সংগীত বোদ্ধাদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর শাস্ত্রীয় সংগীত ও লোকগীতি উভয় ধারাতে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হতো। তাঁর কণ্ঠের তীব্রতা এতই আকর্ষণীয় যে, একবার তিনি গান গাইতে শুরু করলে শ্রোতাদের সময়জ্ঞান সব উবে যেত। শহুরে শ্রোতাদের আকর্ষণ করার জন্য তিনি কখনই কৃত্রিমতার আশ্রয় নেননি, যার ফলে তাঁর পরিবেশিত গানে লোকগানের আদি স্বাদটুকু পাওয়া যায়।রামকানাই দাশকে বাংলাদেশের লোকগানের অগ্রগণ্য সাধকদের একজন বলে অভিহিত করেছেন লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক সুমনকুমার দাশ। তিনি এক লেখায় বলেছেন, ‘যাত্রাগানে তবলা বাদক সংগীত জীবন শুরু করায় লোকগানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা আগে থেকেই ছিল। তবলা বাজিয়েছেন উকিল মুনশি, শাহ আবদুল করিম, আবদুল সরকারসহ প্রখ্যাত বাউলসাধকদের সঙ্গেও। এ ছাড়া শুরুর দিকে তিনি কীর্তন ও করি গান গাইতেন। হারিয়ে যেতে বসা অজ্ঞাত গীতিকারদের রচিত প্রাচীন লোকগান পরিবেশনের পাশাপাশি শিতালং সাহ, রাধারমণ, দুর্বিন শাহ, আজম ফকির, হরি আচার্য, দেবেন্দ্র বাইন প্রমুখ লোকসাধকদের রচিত গানও গেয়েছেন রামকানাই দাশ। যাত্রাপালায় ‘মুখ্য বাইন’-এর পাশাপাশি ‘বিবেক’ চরিত্রে অভিনয় করে গান গেয়েছেন এক সময়। গেয়েছেন বাউল, করি, ফকিরালি, গ্যেষ্ঠ, কীর্তন, ঘাটুসহ নানা ধারার গান। প্রাচীন গানের বৈচিত্র্যময় রূপটিই তিনি শেষ বয়সে দেশে-বিদেশে অকৃত্রিমভাবে তুলে ধরেছিলেন।’

অনুষ্ঠানে আগত সুধী দর্শকদের একাংশ

রামকানাই দাশ ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের গুরু। সংগীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হক লিখেছিলেন, ‘আমাকে কেউ যদি বলেন, দেশের সবচেয়ে ভালো খেয়াল গাইয়ে কে? উত্তর দেওয়ার আগে সঠিক-বেঠিক না জেনেই আমার মনে পড়বে একটি নাম—রামকানাই, সিলেটের রামকানাই।’

এক লেখায় ওয়াহিদুল হক এই বাক্যটিও লিখেছিলেন, ‘আমাদের দেশীয় গ্রাম্য গানের বিষয়েও রামকানাইয়ের রুচি, অভিজ্ঞতা ও অধিকার অতুলনীয়।’ ওয়াহিদুল হক যে অধিকারের কথা রামকানাই দাশ সম্পর্কে লিখেছিলেন, সেটা অধিকার করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়।

রামকানাই দাশ নিজের অর্জনকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ছড়িয়ে দেন প্রজন্মান্তরে। ১৯৮৭ সালের সিলেটে প্রথম স্থাপিত হয় সংগীত পরিষদ। তারপর ২০০০ সালে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে প্রতিষ্ঠিত হয় সংগঠনটির একটি শাখা। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভিন দেশে, ভিন্ন পরিবেশে বাংলা সংগীতের নানা শাখার সঙ্গে পরিচিত হতে পারছে সব প্রজন্মের শিল্পীরা। বংশানুক্রমে যে সংগীতের যে ধারাটি তিনি পেয়েছেন পিতৃপুরুষের কাছ থেকে, সেটাকে রামকানাই শুধু নিজেই লালন করেননি, ছড়িয়ে দিয়েছেন সবার মধ্যে।

রামকানাইয়ের বহুমাত্রিক সংগীত প্রতিভার মূল্যায়নে বিশিষ্ট লোক তত্ত্ববিদ শামসুজ্জামান খানের মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায়, ‘ধ্রুপদি গানের খেয়ালে তাঁর সাধনা ও অর্জন অনন্য। বাংলাদেশে খেয়াল গানের অসাধারণ এক শিল্পী রামকানাই দাশ। তবে শুধু খেয়াল বা নানা ঘরানার ধ্রুপদি গান নয়, সিলেট অঞ্চলের লোকসংগীতের এক সাধক ও শিক্ষাগুরু ছিলেন এই গুণী মানুষটি।

Akbar H Kiron
By Akbar H Kiron আগস্ট ২০, ২০১৭ ০২:৫৪
Write a comment

No Comments

No Comments Yet!

Let me tell You a sad story ! There are no comments yet, but You can be first one to comment this article.

Write a comment
View comments

Write a comment

Your e-mail address will not be published.
Required fields are marked*

সর্বশেষ খবর

আজকের দিন-তারিখ

  • বৃহস্পতিবার ( রাত ৯:০১ )
  • ২৩ নভেম্বর, ২০১৭
  • ৫ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯
  • ৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ ( হেমন্তকাল )

বাংলা ক্যালেন্ডার

IMG_11152014_10_DEBDUT!