তীব্র মুনাফা লোভের শিকার রানাপ্লাজার হতভাগ্য শ্রমিকেরা

New York Bangla
By New York Bangla মে ২৪, ২০১৩ ২১:৫৬

সুব্রত বিশ্বাস, নিউইয়র্ক :- ’পুঁজিবাদ হলো সর্বোচ্চ পণ্য উৎপাদন যেখানে শ্রমশক্তিও পণ্যে রূপান্তরিত হয়’-লেনিন। দুনিয়ার ডাকসাইটে পত্রিকা ইকনমিস্ট বলছে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা বস্ত্রশ্রমিক পাওয়া যায় বাংলাদেশে। স্বাভাবিকভাবেই কর্পোরেট সুত্র মেনে বস্ত্রশিল্পের কারখানার জোয়ার তাই বাংলাদেশে। বিদেশী কোম্পানীগুলোর মুনাফা লোটার প্রথম শর্তই হচ্ছে সস্তা শ্রম। ছুটে এসেছে তাই ওয়ালমার্ট, গ্যাপ, নাইক কোহল, ফোর সিজনস, পেলো-দুনিয়ার তাক লাগানো নামীদামী সব ব্রা-। এদের মুনাফা যত লাগামছাড়া ও বেহিসেবি শ্রমিকশোষণও তত তীব্র ও বেপোরয়া।

ফলস্বরূপ, এপ্রিলের ২৪ তারিখের-সাভার ট্যাডেজি। রাজধানী ঢাকা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে সাভারে ন’তলা বহুতল ‘রানাপ্লাজা’ ধ্বসে মোট মৃতের সংখ্যা ১১২৭। চিরকালের মতো পঙ্গু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ১০০০-এর বেশি। এই রানাপ্লাজায় ছিল ৫টি বস্ত্র কারখানা। আগেরদিনই ভবনটিতে ফাটল ধরে। ঐ ভবনের দোতলায় থাকা ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মালপত্র সরিয়ে নিয়ে কাজ বন্ধ রাখলেও ঐ ভবন ও গার্মেন্টস কোম্পানীর মালিকেরা বস্ত্রশ্রমিকদের বেতন কেটে নেওয়া হবে এই ভয় দেখিয়ে এবং রীতিমত লাঠিপেটা করে পরদিন কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেছিল ঐ মরণকুপে। আগের দিনের মারাত্মকভাবে ফাটল ধরা বহুতলে পরদিন জোর করে প্রবেশ করানো হলো প্রায় ৩০০০বস্ত্রশুমিককে। ফলে কোন মতেই এটি দুর্ঘটনা নয়. এটি একটি হত্যাকা-।

বাংলাদেশ অর্থনীতির ভরকেন্দ্র এই বস্ত্রশিল্প। দেশের মোট রপ্তানির ৮০শতাংশ অংকের হিসেবে ১৯ বিলিয়ন ডলার প্রতি বছরে দেশজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে ৬০০-এর বেশি গার্মেণ্টস ফেক্টরি। শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ। সস্তার শ্রমিক-মজুরি বাকি সব দেশের তুলনায় সর্বনিম্ন। ফলে শোষণও লাগামছাড়া। দেশের গার্মেন্টস মালিকরা বিশ্ব বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য সস্তাশ্রমের সুবিধা ধরে রাখতে মরিয়া। আসলে সেই ‘ধান্দার ধনতন্ত্র’। নয়া উদার অর্থনীতির দেশগুলোর এটাই বৈশিষ্ট।

বাংলাদেশের বস্ত্রশ্রমিক এই ট্র্যাজিক লড়াই না অসংবেদনশীলতার একটা লড়াই। বস্ত্রশ্রমিকের কাজ করতে হয় দিনে ১৬ থেকে ১৮ঘন্টা। বেশিরভাগ শ্রমিকেরই চাকরির কোন স্থায়ী নিয়োগপত্র নেই। ’নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিত্তিতে বিক্রি হয় সস্তাশ্রম। অস্থিরতা, উশৃঙ্খলতার সামান্য অভ্যাস দেখলেই ছাটাই। নিতান্ত অনিশ্চয়তায় ভরা জীবন। সবসময় চরম উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ-মালিকপক্ষের চাপে শ্রমিকপক্ষ দিশেহারা। তাহলেই তো পাওয়া যাবে সর্বোচ্চ কাজ এবং সবচেয়ে সস্তায়। থাকার জায়গা বলতে বস্তির স্যাঁতসেঁতে ঘর, নেই পর্যাপ্ত পানি, আলো এবং বাতাস। নেই শৌচাগার। হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর মাসের শেষে আয় ৩৫০০ টাকা। বস্ত্রশ্রমিকদের মধ্যে ৭০ শতাংশই মহিলা। সরকারী হিসেবের দিকে চোখ বোলালেই বোঝা যাবে বস্ত্রশ্রমিকদের করুন পরিণতি। আগুন লেগে এবং ফেক্টরী দুর্ঘটনায় ২০০২ সালে মোট মৃত ১৬৮জন, ২০০৩ সালে ২৫১জন, ২০০৪-এ ১৮৮জন, ২০০৫-এ ৪৬৫জন, ২০০৬-এ ৯৭৪জন, ২০০৮-এ ৫৪৭জন, ২০০৯-এ ৩৭৮জন, ২০১০-এ ৭০৩জন।

যেখানে একজন শ্রমিক একবেলা কাজে কামাই দিলে চাকরি হারান সেখানে ক্ষমতাধর মালিকরা বারে বারে রেহাই পেয়ে যায় নিরীহ হাজার হাজার শ্রমিককে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিয়েও। সবসময়ই এই মালিকেরা অধরাই থাকেন, কোন সময় ধরা পড়লেও সরকারী লবির জোরে ছাড়া পেতে সময় লাগে না। এর আগের যে-কোনও একটা হত্যাকা-ের সঠিক বিচার হলেও এই সাভার ট্র্যাজেডি আর ঘটতো না। সরকারী স্তরে ১৮ জনের একটি কেন্দ্রীয় আধিকারিকের দল আছে, যাদের দায়িত্ব বস্ত্রশিল্পের শ্রমিকদের সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকক হলেও সত্যি-মাসের পর মাস তাদের নীরবতার জন্য তারা প্রতিমাসেই পেয়ে যান মোটা মাসোহারা। আসলে গার্মেন্টস মালিকরা দেশের একটা শক্তিশালী গোষ্ঠী। সরকারী মহলের বড় কর্তা, এম পি-দের সাথে যাদের নিয়মিত ওঠাবসা। ফলে নিশ্চিন্তে নিরাপদেই থাকেন তারা। অন্যদিকে যে শ্রমিকের ঘামে ঝরা রক্তে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার হয়, জি ডি পি বৃদ্ধি হয়, যে শ্রমিকরা দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান শক্তি, তারাই অর্ধভুক্ত অবহেলিত এবং পরিকল্পিতভাবেই আহত ও নিহত।

সাভার ট্র্যাজেডি আসলে কর্পোরেট কিলিং-এর এক ভয়াবহ উদাহরণ। বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের শেষ প্রান্তে আছে আধুনিক উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর ধনী হাসিমুখ, আর শুরুর প্রান্তে রয়েছে হামিদা, শাহিনা, নাজমার মতো জীবনধারণের তাগিদে কাজ করতে আসা গ্রামবাংলার সহজসরল মলিন মুখ। তাদের জীবন জীবিকায় তুমুল অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার সুযোগ নিচ্ছে বিদেশী বড় বড় চেইন শপের মালিক শিল্পপতিরা। যাদের ব্রা- আইটেমের চাহিদা দুনিয়াজোড়া। ডিজ্নি ফ্যাশনস, প্রাইমার, ওয়ালমার্টের ঝাঁ চকচকে শোরুমে ঠাই পাচ্ছে বাংলার সস্তাশ্রমিকদের ’মূল্যবান’ শ্রম। বিদেশী এই সব নামীদামী কোম্পানিরা ঘনঘন তাদের প্রতিনিধিকে বাংলাদেশে পাঠান তাদের অর্ডার দেওয়া কাজের তদারকির জন্য। শ্রমিকের দুরবস্থা নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথাই নেই। কারণ এই সস্তাশ্রমের জন্যই তারা ছুটে আসছেন। তথ্য বলছে, আমেরিকাতে একটি জিনসের শার্ট তৈরিতে খরচ হয় ১৩ ডলার, বাংলাদেশে সেখানে খরচ মাত্র ৪ ডলার। আমেরিকাতে এই একটি শার্ট তৈরির জন্য শ্রমিক মজুরি ৭ ডলার, অন্যদিকে বাংলাদেশে মাত্র ০.২২ ডলার। বিখ্যাত সংস্থা ফোর সিজন্স কোম্পানির কর্ণধার রোজাদাদা বলছেন, ‘বাংলাদেশে শ্রমিকদের মজুরি মাত্র ৭০ ডলার প্রতিমাসে, তাই ঐ দেশ থেকেই পোশাক তৈরি করে নিয়ে আসা আমাদের পক্ষে লাভজনক’। সাভারের নিহতের সংখ্যা, আহতের পরিসংখ্যান এবং শ্রমিকদের জীবনের লেখচিত্র এই রোজাদাদার মতো মুনাফাখোরদের কাছে সম্পূর্ণ মূল্যহীন। তাদের লক্ষ্য একটাই সর্Ÿোচ্চ লাভের জন্য সর্বোচ্চ শোষণ।

প্রসঙ্গত, বছর কয়েক আগের কথা। কঠোর নিরাপত্তার বেড়াজালে লেবাননে ওয়ালমার্টের অনুদানে পরিচালিত একটি ফেক্টরির সংবাদ বহু কষ্টে আহরণ করেছিলেন আমেরিকারই এক সাংবাদিক। এমনিতেই ভয়ে ওয়ালমার্টের সংবাদ পরিবেশন করেননা কোন সাংবাদিক। একটি বাংলাদেশী শ্রমিকের সহায়তায় তিনি সক্ষম হয়েছিলেন সংবাদটি সংগ্রহ করতে। বাংলাদেশী শ্রমিক তাকে নিয়ে যায় তাদের থাকার জায়গাটি দেখাতে। টিনের একচালার এক বিরাট গোদাম ঘর। ভেতরে পুরোটাই খোলা। ফ্লোরে সারিবদ্ধভাবে শ্রমিকের বিছানা। সবের জন্য আলাদা কোন বিছানা নেই। কাজের সময় অনুসারে পালাক্রমে এক বিছানাতেই অনেককে শু’তে হয়। রান্নার কোন ব্যবস্থা নেই। সবের জন্য মাত্র একটি শৌচাগার। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে এগুলো ব্যবহার করতে হয়। অন্যদিকে যথাসময়ে কাজে যোগ না দিলে বেতন কাটা এমনকি শারিরিক নির্যাতনেরও ভয় থাকে। ফলে অনেককে সপ্তাহ দশদিনে একবার গোসল করতে হয়। সেটিও আবার অপর্যাপ্তভাবে। শৌচাগারটি নিতান্ত অব্যবহারযোগ্য। অনেকে ৮/১০মাস যাবৎ বেতন পাননি। দিনে একবেলা পর্যাপ্ত খাবারও জোটে না। পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য সকলের পাশপোর্ট কর্তৃপক্ষ নিয়ে রেখেছে। এই করুণ ঘটনার ইতিহাস প্রকাশিত হয়েছিল আমেরিকারই একটি জার্নালে।

সাভারের রানাপ্লাজায় ছিল প্রতি ইঞ্চিতে মৃত্যু। কারো মাথায় বিম ভেঙ্গে পড়েছে, কেউ চাপা পড়েছেন মোটা থামের নীচে, কারো বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে লোহার শিক, কেউ মারা গেছেন ধ্বংসস্তুপের মধ্যে আটকে থেকে পর্যাপ্ত পানি, অক্সিজেনের অভাবে। গত বছর নভেম্বরের তাজরিনের আগুনে পোড়া ১১৫টা লাশের দগদগে ঘা এখনো শুকোয়নি বস্ত্রশ্রমিকদের, নতুন করে আরো ১২২৭জনের ভার। তাজরিনের ঘটনাতেও তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছিল। কিন্তু এখনো পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়নি ঐ কোম্পানির মালিক।

বস্তুত, দিনে আটঘণ্টা কাজের অধিকার আজ ইতিহাসের পাতায়। শিল্পপতিরা বেআইনী লকআউট করতে পারে, কিন্তু শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নেই। শ্রমিক আন্দোলন মানেই দেশী-বিদেশী পুঁজিপতিদের কাছে ’ভুল বার্তা’ দেশের সম্মানহানি। গত বছর এপ্রিলেই বস্ত্রশ্রমিকদের দাবি আদায়ে সোচ্চার হওয়া আমিনুল ইসলামকে খুন করে গার্মেন্টস মাকিদের ভাড়াটে গু-ারা। নভেম্বর ২০১২-তে জ্বলন্ত তাজরিন ফ্যাশনের তিন তলায় আটকা পড়া একজন বস্ত্রশ্রমিক ফোন করে তার মাকে শেষবারের মতো বলেছিলেন, আমি আর বাঁচবো না মা, কোমরে বাধা শার্ট দেখে আমার লাশটা চিনে নিও’। সেদিনের বিধ্বংসী অগ্নিকা-ে প্রাণ হারিয়ে ছিলেন ১১৫জন শ্রমিক।

মাঝের ব্যবধান মাত্র পাঁচ মাসের। সাভারের ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে উদ্ধার হওয়া একজন শ্রমিকের মৃতদেহের হাতের মুঠোয় একটা চিরকুটে লেখা, মা, বাবা, আমায় ক্ষমা করো। তোমাদের চিকিৎসার ওষুধ আমি আর কিনতে পারবো না। তাই, তুই দেখিস মা বাবাকে। 

New York Bangla
By New York Bangla মে ২৪, ২০১৩ ২১:৫৬
Write a comment

No Comments

No Comments Yet!

Let me tell You a sad story ! There are no comments yet, but You can be first one to comment this article.

Write a comment
View comments

Write a comment

Your e-mail address will not be published.
Required fields are marked*

সর্বশেষ খবর

আজকের দিন-তারিখ

  • বৃহস্পতিবার ( রাত ৩:৩২ )
  • ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
  • ২৯ জিলহজ্জ, ১৪৩৮
  • ৬ আশ্বিন, ১৪২৪ ( শরৎকাল )

বাংলা ক্যালেন্ডার

IMG_11152014_10_DEBDUT!